ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতিতে ছদ্মবেশী ‘স্মার্ট’ তরুণী

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৩, ২৩:০১
গুলশানের গৃহবধূ মাসুমা সুলতানাকে মোবাইল ফোনে ব্যাংক থেকে জানানো হয় যে, তার ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে ৭০ হাজার টাকার পণ্য কেনা হয়েছে। তখন তিনি বলেন, কোন পণ্য কিনেননি। গত ৩ এপ্রিল গুলশান-১ নম্বরে একটি রেস্টুরেন্ট থেকে তার ভ্যানিটি ব্যাগ চুরি হয়। ভ্যানিটি ব্যাগে ওই ক্রেডিট কার্ড ছিল। ঐ ঘটনায় তিনি ৪ এপ্রিল গুলশান থানায় একটি জিডি করেন। এরপর গত মঙ্গলবার সকালে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর রোডের ২৩ নম্বর বাড়ির সামনে অজ্ঞাত একজন রোগীর অ্যাপোলো হাসপাতালের ব্যবস্থাপত্র পড়ে থাকতে দেখে র্যাব। ঐ ব্যবস্থাপত্রে রোগীর মোবাইল নম্বরে ফোন করে র্যাব জানতে পারে যে তিনিই মাসুমা সুলতানা। গত ৩ এপ্রিল তার ভ্যানিটি ব্যাগটি ক্রেডিট কার্ডসমেত চুরি হয়ে যায়। র্যাবের ক্যাপ্টেন আশরাফ ধারণা করেন, কেউ ঐ ব্যবস্থাপত্রটি ২৩ নম্বর বাড়ি থেকেই রাস্তায় ফেলে দিয়েছে। এরপর র্যাব সোর্সের মাধ্যমে জানতে পারে ২৩ নম্বর বাড়ির ৭ম তলায় দুই তরুণী থাকেন, যাদের চলাফেরা ঐ অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দাদের দৃষ্টিতে সন্দেহজনক। পরে র্যাব ঐ ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫ লাখ টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ বিদেশি প্রসাধনী সামগ্রী, ৫টি এল ই ডি টেলিভিশন ও অন্যান্য মালামাল উদ্ধার করে। গ্রেফতার করে ঐ ফ্ল্যাটের বাসিন্দা আয়েশা সিদ্দিকা উর্মি (২০), উজ্জল হোসেন (২৯) এবং জোবাইদা সুলতানাকে (৩২)। পরে জানা যায়, তারা চুরি করা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে এসব পণ্য কিনে অন্যত্র বিক্রি করে দিতেন। এই চক্রটি গত ২২ মার্চ গুলশানের বাটন রোজ নামের একটি রেস্টুরেন্ট থেকে জনৈক হাবিবার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ক্রেডিট কার্ড চুরি করে। পরে তারা উত্তরার একটি চেইন শপ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকার পণ্য ক্রয় করেন। এরকম ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি চক্র রাজধানীতে সক্রিয়। র্যাবের মিডিয়া এ্যান্ড লিগ্যাল শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার হাবিবুর রহমান বলেন, রাজধানীতে ভদ্রবেশী ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি চক্রকে সনাক্ত করা খুবই কঠিন। জালিয়াত চক্রের মধ্যে একদল স্মার্ট তরুণী আছেন। এরা ছদ্মবেশে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন। এরপর কৌশলে তাদের ক্রেডিট কার্ড চুরি করেন। পরক্ষণে তারা ওই কার্ড ব্যবহার করে শপিং মল থেকে দামি পণ্য কিনে ফেলেন। কারণ ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পণ্য ক্রয় করতে গোপন পিন নম্বর প্রয়োজন হয় না। এ ক্ষেত্রে যিনি কার্ড চুরি করেন, তিনি তাত্ক্ষণিক কোন শপিং মলে গিয়ে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দামি পণ্য কিনে ফেলেন। এছাড়া আরো কয়েকটি মাধ্যমে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি হচ্ছে। ক্রেডিট কার্ডধারী কোন ব্যক্তির সঙ্গে জালিয়াত চক্র সখ্যতা গড়ে তোলে। পরে কৌশলে কার্ডের পিন নম্বরটি জেনে নেয় এবং তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যে স্বাক্ষর রয়েছে তা জাল করতে শেখে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা ডাক বিভাগ থেকে কৌশলে পিন নম্বর যোগাড় করে কম্পিউটার ও কার্ড বানানোর যন্ত্র দিয়ে অনায়াসে ক্রেডিট কার্ড তৈরি করা যায়। কার্ডের পিন কোড ব্যবহার করে গত বছর ইউসিবি ব্যাংক থেকে ১২ কোটি টাকা আত্মসাত্ করেছিলেন ঐ ব্যাংকের চার কর্মকর্তা। এই অভিযোগে ঐ চার কর্মকর্তাকে পুলিশ ব্যাংকের সহায়তায় গ্রেফতার করে। র্যাবের একটি সূত্র জানায়, ডাক বিভাগের মাধ্যমে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির ঘটনায় গত বছর গুলশান থেকে কামাল আহমেদ ওরফে নূরুল আমিন ওরফে দাদা ভাই নামে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি চক্রের সবচেয়ে বড় সদস্য গ্রেফতার হয়েছিল। বিদেশ থেকে নিরাপত্তার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগের মাধ্যমে বিদেশি সংস্থার কর্মকর্তা ও বিদেশে থাকা ধনীরা তাদের সন্তান ও নিকট আত্মীয়ের কাছে ক্রেডিট কার্ড পাঠিয়ে থাকেন। বিদেশ থেকে আসা খামগুলো ক্রেডিট কার্ড জালিয়াত চক্রের সঙ্গে জড়িত ডাকপিয়ন ও কর্মকর্তারা পিন দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখেন। যদি অনুভব হয় খামের মধ্যে কার্ড আছে তা হলে ঐসব খাম তারা রেখে দেন। পরে তারা ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে দাদা ভাইয়ের কাছে বিক্রি করে দেন। এসব কার্ড দিয়ে দাদা ভাইয়ের লোকজন বিভিন্ন শপিং মল থেকে নানা ধরনের দামি পণ্য কিনেন, ঐসব পণ্য নামি-দামি শপিং মলের দোকানিদের কাছে কম দামে বিক্রি করে দেন। গত বছরের ১৩ জুন একটি সুইডিশ কোম্পানির কান্ট্রি ম্যানেজার মিস ব্রান্ড হিল্ড ডেস্কক্যাম্পসের নামে ডাক বিভাগের মাধ্যমে একটি ইউরো ক্রেডিট কার্ড আসে। তিনি কার্ডটি না পেয়ে গুলশান থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, সুইডেন থেকে প্রায় ২৬ লাখ টাকা লিমিটের একটি ইউরো কার্ড ডাক বিভাগের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। কিন্তু কার্ডটি তিনি না পেয়ে সুইডিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানান, কার্ডটি বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে, যা ২৬ মে থেকে ব্যবহার হচ্ছে। তিনি গুলশান থানায় একটি মামলা করেন। মামলার সূত্র ধরে ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশ দাদা ভাই ও গুলশান পোস্ট অফিসের পিয়ন আব্দুর রবসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করে। গত বছর ২৩ এপ্রিল ধানমন্ডির ব্যবসায়ী সাদিকুল ইসলামকে তার ব্যাংক থেকে ফোন করে জানানো হয় যে, তার ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে অনলাইনে এক লাখ ৩৩ হাজার টাকার পণ্য কেনা হয়েছে। তখন তিনি এ পণ্য কেনেননি বলে ব্যাংককে জানালে ঘটনাটি ধরা পড়ে। এ ব্যাপারে তিনি ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা করলে পুলিশ তদন্ত করে মোহাম্মদপুর থেকে একটি চেইন শপের কর্মচারী জুবায়ের হোসেন শাহেদ (২২) ও খলিলকে (২৬) গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা জানায়, সাদিকুল ইসলাম নামের ঐ ব্যবসায়ী ২২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরের একটি চেইন শপ থেকে এক হাজার টাকার মালামাল কেনেন। এ সময় কর্মচারী শাহেদ তার কার্ড পাঞ্চ করতে গিয়ে কৌশলে ক্রেডিট কার্ডের বাহকের নাম, ঠিকানা ও টাকার ব্যালেন্স জেনে নেয়। এরপর ঐ তথ্য দিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে আরো কিছু আইটি নির্ভর তথ্য দিয়ে অনলাইনে ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকায় দুইটি ল্যাপটপ কেনেন। র্যাব-১ ক্যাপ্টেন আশরাফ জানান, ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দোকান থেকে পণ্য ক্রয়ের সময় বাহকের চেয়ে দোকানদারদের সতর্ক হতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাহকের দেয়া স্বাক্ষরের সঙ্গে ক্রেডিট কার্ডের স্বাক্ষর মিলিয়ে নিতে হবে। প্রতারক চক্ররা অনেক ক্ষেত্রে তাদের বাবা বা মায়ের ক্রেডিট কার্ড বলে পণ্য ক্রয় করে। কারণ পণ্য ক্রয়ের সময় ক্রেডিট কার্ডের পিন নম্বর প্রয়োজন হয় না। শুধু ক্রেডিট কার্ড মেশিনে প্রবেশ করিয়ে মোট ব্যালেন্স থেকে ক্রয় করা পণ্যের দাম বাদ দিয়ে দিলেই মূল্য পরিশোধ হয়ে যায়।