১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের তিন মাস আগেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে সম্প্রতি উইকিলিকসের ফাঁস করা এক মার্কিন তারবার্তায় বলা হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ২৩ মে তারবার্তাটি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের কাছে পাঠিয়েছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত তত্কালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ইউজিন বোস্টার। উল্লেখ্য, গত সোমবার প্রায় ১৭ লাখ গোপন তারবার্তা প্রকাশ করে উইকিলিকস। ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে এসব তারবার্তা এসেছিলো। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো হয়েছিলো প্রায় চার হাজার ৫১১টি তারবার্তা।
তারবার্তায় বলা হয়, ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় একটি টেলিভিশন ভবন উদ্বোধন শেষে বাসায় ফেরার পথে ২১ মে সন্ধ্যায় শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয় বলে দুটি সূত্র থেকে তথ্য পায় মার্কিন দূতাবাস। প্রথম তথ্যটি দেন মার্কিন দূতাবাসের একজন বাঙালি রাজনৈতিক সহকারী। তিনি এ তথ্য জেনেছিলেন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা ইউনিটের দায়িত্বে থাকা পুলিশের একজন ডেপুটি সুপারিনটেন্ডেন্টের কাছ থেকে। অন্য তথ্যদাতা হলেন একজন সাংবাদিক। যিনি দূতাবাসের তথ্য কর্মকর্তাকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি জানান, এ খবরটি প্রকাশ না করতে তখন প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলো। দুটি সূত্রই জানায়, হামলায় গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছিলো। এতে দুই ব্যক্তি আহত হলেও শেখ মুজিবুর রহমান অক্ষত ছিলেন।
গোপনীয় উল্লেখ করে শেখ মুজিবকে হত্যার পরদিন অপর একটি তারবার্তা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠান মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস বোস্টার। বাংলাদেশের জনগণ মুজিব হত্যার পর কোন আনন্দ উদযাপন করেনি। এ হত্যাকাণ্ডকে জনগণ ‘শান্তভাবে’ মেনে নিয়েছে সম্ভবত তারা এটিকে এক ধরনের মুক্তি হিসাবে মনে করছে।
একই বছরের ১৬ আগস্ট অপর একটি তারবার্তায় ডেভিস বোস্টার উল্লেখ করেন, নতুন সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হলো, এটা তুলনামূলক স্বস্তিকর মনে হচ্ছিলো। যতদূর বোঝা যায়, বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে শেখ মুজিবুর রহমান ব্যর্থ হওয়ায় জনগণের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়েছিলো। এছাড়া রাজনৈতিকভাবে নিজেকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নেয়ার বিষয়ে তার আকাঙ্ক্ষাও এর কারণ ছিলো। ১৬ আগস্টের তারবার্তায় আরো বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের জন্য ভারতের স্বাধীনতা দিবসকে বেছে নেয়া হয়।
এ তারবার্তায় খন্দকার মুশতাক আহমেদের গঠিত সরকারের বিষয়ে মন্তব্য করা হয়েছিল। নতুন প্রেসিডেন্ট ভারত বিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত। এতে বলা হয়, সরকারের মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে, তারা পাকিস্তানসহ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সরকারের সম্পর্ক বিষয়ে তিনি লিখেছিলেন, মুজিব সরকারের চেয়ে আরো বেশি আন্তরিক সম্পর্ক হতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার আমাদের কাছে আরো বেশি সহায়তা চাইতে পারে।
মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার ১০ দিন আগে বোস্টার তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছিলেন। এ সাক্ষাতের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টের মেজাজ খুব ভালো ছিলো। তিনি আমাদের সঙ্গে আলোচনায় সবসময় বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব দেখান। অন্যদিনের তুলনায় তিনি এদিন অনেক বেশি আন্তরিক ছিলেন।
