সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতা, বিভিন্ন নারী সংগঠন এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবির ব্যাপারে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন—এমন অভিযোগ করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে সংগঠনের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকার মহাসমাবেশে উপস্থাপিত ১৩ দফার বিস্তারিত ব্যাখ্যা শিগগিরই উপস্থাপন করা হবে। এসব অপপ্রচারের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও শরীয়া বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিম ১৩ দফা কিভাবে মানুষের জন্য কল্যাণকর এবং বাস্তবায়নযোগ্য হতে পারে তার ব্যাখ্যা তৈরি করছেন। হেফাজতে ইসলাম-এর আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী এই টিমের কর্মকাণ্ডের সমন্বয় করছেন। ১৩ দফার বিস্তারিত ব্যাখ্যার খসড়া তৈরি হয়েছে, শিগগিরই দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমরা তা চূড়ান্ত করবেন। আলেমদের অনুমোদনের পর সরকারকে তা দেয়া হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে ব্লাসফেমি আইন না করার ঘোষণা দেয়ার পাশাপাশি এবং হেফাজতে ইসলাম-এর বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়েও কথা বলেছেন।
বিবৃতিতে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, আমাদের ১৩ দফা দাবির কোথাও ‘ব্লাসফেমি’ আইনের উল্লেখ নেই। আমাদের দাবি হচ্ছে ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে কুরআন-হাদীসে যে বিধান রয়েছে তার আলোকে সংসদে কঠোর একটি আইন পাস করা, যাতে কেউ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে দেশে কোন সামাজিক বিশৃঙ্খলা বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাতে না পারে।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ব্লাসফেমি বলে যদি আমাদের এই দাবিকে বুঝিয়ে থাকেন তবে বলা যায় তিনি এদেশের কোটি কোটি মুসলমানের মনের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। সরকার ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতি এবং কোটি কোটি মুসলমানের প্রত্যাশা ও দাবির প্রতি নজর না দিলে চরম ভুল করবে। তাছাড়া ধর্ম অবমাননা রোধ এবং মুসলমানদের ঈমান-আক্বীদা ও ধর্মীয় অনুশাসনের সুরক্ষার তাগিদে হেফাজতে ইসলাম ঘোষিত ১৩ দফা দাবিকে মধ্যযুগীয় বলার মানে পুরো ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের নিয়ে বিদ্রূপ করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।
জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থই হলো ধর্মহীনতা। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে মূলত জাতিকে নাস্তিকতার দিকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে।
তিনি আরো বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত কয়েক বছর থেকে দেশি-বিদেশি ইসলাম ও মুসলমানদের দুশমনরা এদেশের সরলমনা মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে নাস্তিকতার দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ও কূটচাল চালিয়ে আসছে। এর ধারাবাহিকতায় নাস্তিক্যবাদিরা সম্প্রতি এদেশের জাতীয় আবেগকে পুঁজি করে ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন বা কম জ্ঞান রাখেন এমন কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করে শাহবাগে গণজাগরণের নাম দিয়ে প্রকাশ্য মাঠে নামিয়েছে। তারা শুধু আল্লাহ, রাসূল (সা.), ইসলাম ও মুসলমানদের নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে থামেনি। সাথে সাথে আবহমান বাংলার রক্ষণশীল সামাজিক অনুশাসন ও সংস্কৃতির ওপরও আঘাত দিতে শুরু করেছে। বিয়ে বহির্ভূত ও ঘনিষ্ঠ অনাত্মীয় নারী-পুরুষের দৃষ্টিকটু বিচরণ ও রাস্তায় রাত্রিযাপনের মত ভয়াবহ সংস্কৃতি ওরা চালু করছিল। দাড়ি-টুপীধারী, বয়োবৃদ্ধ মুসলমান ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রতি ওরা যেভাবে হামলে পড়ছে, তা অমুসলিম দেশেও সচরাচর দেখা যায় না।
অন্যদিকে প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ ও ভাস্কর্যের নামে মূর্তি নির্মাণ বন্ধের দাবি সম্পর্কে একটি মহল থেকে সমালোচনা করা হচ্ছে জানিয়ে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা শামসুল আলম বিবৃতিতে বলেন, নারী-পুরুষের দৃষ্টিকটু অবাধ মেলামেশা বন্ধ করার দাবির অর্থ এই নয় যে, নারীরা শিক্ষার্জন করতে, কর্মক্ষেত্রে যেতে বা ঘর থেকে বের হতে পারবে না। আমাদের উদ্দেশ্য হলো নগ্নতা ও বেহায়াপনা বন্ধ করা। আমরা তো নারীর পক্ষেই বলছি। ইসলাম নারীর নিরাপত্তা এবং শান্তির জন্য হিজাব প্রথা বাধ্যতামূলক করেছে। কাজেই পর্দা সহকারে নারীরা নিরাপদ কর্মক্ষেত্রে বা ঘর থেকে বের হতে তো কোন বাধা নেই। ইসলাম নারীর নিরাপত্তার দিকটা কঠোরভাবে দেখে। কেবল সুযোগসন্ধানীরাই এটাকে নারী অবদমন বলে অপপ্রচার চালায়। ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্মে তো নারীর ন্যায্য অধিকারই নেই। শাহবাগে যেভাবে নারী-পুরুষের একসাথে রাত্রিযাপন, অবস্থান এবং বেহায়াপনা হয়েছে তা একটি জাতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে।
বিবৃতিতে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে বলা, দেশে ভাস্কর্যের নামে আবক্ষ মানব বা জীবজন্তুর মূর্তি তৈরি ও ফুল দিয়ে সেসবকে সম্মান প্রদর্শনের রেওয়াজ যে হারে শুরু হয়েছে তা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে কখনো কাম্য হতে পারে না। ইসলামে স্পষ্টভাবে মূর্তি তৈরি ও সম্মান প্রদর্শনকে শিরক ও হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। তবে আমরা কখনো প্রাণহীন শিল্পকর্মের বিরোধী নই। মোমবাতি প্রজ্বলন অগ্নিপূজক ও পশ্চিমা সংস্কৃতি। কথিত গণজাগরণ মঞ্চ থেকে এটাকে এদেশে নতুন করে প্রচলনের জোর চেষ্টা চলছে। কাজেই আমাদের দাবি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো বা বিরোধিতার সুযোগ নেই।
