শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আন্তরিক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করিয়াছে। সুপারিশটি খুবই ভালো। বিশেষ করিয়া আমাদের নারী পোশাক শ্রমিকদের শীর্ণ অপুষ্ট দেহ ও করুণ মুখচ্ছবি প্রত্যক্ষ করিয়াছেন—এমন কোনো মানুষের পক্ষে ইহার যৌক্তিকতা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, পোশাক শিল্প আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত হিসাবে বিবেচিত হইয়া আসিতেছে দীর্ঘদিন যাবত্। ইতোমধ্যে পোশাক রফতানিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ হিসাবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার স্বীকৃতিও অর্জন করিয়াছে বাংলাদেশ। আর এই ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের অবদানই যে মুখ্য তাহাও সর্বজনবিদিত। কারণ পোশাক শিল্পে কর্মরত প্রায় ২৫ লক্ষ শ্রমিকের মধ্যে ৮৫ শতাংশই নারী। পরিতাপের বিষয় হইল, উপর্যুপরি অর্থনৈতিক মন্দাসহ নানা দুর্যোগ-দুর্বিপাকের মধ্যেও যাহারা আমাদের অর্থনীতির দেহে নিরন্তর রক্ত-সঞ্চালন করিয়া চলিয়াছেন, তাহারা নিজেরাই ভুগিতেছেন অপুষ্টিজনিত ভয়াবহ রক্তশূন্যতায়। এই তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার। তবে এই বাস্তবতা অনুধাবন করিবার জন্য কোনো প্রকার গবেষণা কিংবা বিশেষজ্ঞ মতামতের প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে হয় না। গুটিকয় ব্যতিক্রম বাদে পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের বৃহদংশকেই ইহার জীবন্ত বিজ্ঞাপন হিসাবে উপস্থাপন করা যায়।
পোশাক শিল্পে কর্মরত নারীর স্বাস্থ্য সমস্যার তালিকা দীর্ঘ। তন্মধ্যে অপুষ্টিজনিত সমস্যাই যে প্রধান তাহাতে সন্দেহ নাই। অপুষ্টির সাথে তাহাদের সামাজিক অবস্থান ও উপার্জনের সম্পর্ক যে অবিচ্ছেদ্য তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। ইহা সত্য যে, পোশাক শিল্প তৃণমূলের অতি দরিদ্র পরিবার হইতে আসা এইসব নারীর জীবন বদলাইয়া দিয়াছে। পাশাপাশি বিশ্ব-মানদণ্ডে তাহাদের বেতন বা মজুরি যে একেবারে তলার দিকে তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই। সারা মাস প্রাণান্ত পরিশ্রমের পর যেই বেতন তাহারা পায় তাহা দিয়া একজনের পক্ষেই স্বাস্থ্যসম্মতভাবে জীবনধারণ করা কঠিন। অথচ এই অর্থ দিয়াই একজন পোশাক শ্রমিককে পরিবারের একাধিক সদস্যের ভরণপোষণ করিতে হয়। ফলে তাহাদের পক্ষে পরিমিত পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য গ্রহণ করা সম্ভব হইয়া ওঠে না। তবে ইহা মুদ্রার একপিঠ মাত্র। অন্যপিঠে নিজেদের স্বাস্থ্যসম্পর্কিত অসচেতনতার যে চিত্রটি রহিয়াছে—তাহাও কোনো অংশে কম ভয়াবহ নহে। জরিপে দেখা গিয়াছে যে, বেশিরভাগ পোশাক শ্রমিকই পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার ও নিজ নিজ স্বাস্থ্যসুরক্ষা বিষয়ে সচেতন নহে। কমদামেও যে উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবার খাওয়া যায় তাহা অনেকেই জানেন না। অসুস্থ হইলে এখনও তাহারা ঝাড়ফুঁক ও তাবিজকবচ গ্রহণ করেন। প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি, এইচআইভি/এইডস ও হেপাটাইটিস বি-সহ সংক্রামক ব্যাধি সম্পর্কে গুরুতর অসচেতনতার কারণে প্রায়শ সামান্য সমস্যাও জটিলাকার ধারণ করে। সর্বোপরি, এইসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের অভাব সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও দুর্বিষহ করিয়া তুলিয়াছে।
পুষ্টিহীনতার মতো স্বাস্থ্য-সমস্যা সমাধানের একটি উপায় হইল জীবনমানের উন্নয়ন। ইহার সহিত বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সম্পর্ক প্রায় অবিচ্ছেদ্যই বলা চলে। সরকার ও পোশাক শিল্পের মালিকদের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রাখিতে হইবে। পাশাপাশি অন্যভাবেও তাহাদের দুর্ভোগের ভার কিছুটা লাঘব করা যায়। পোশাক শ্রমিকদের উপার্জনের প্রায় সবই ব্যয় হইয়া যায় খাদ্য ও বাসস্থানের পিছনে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেই বাসস্থানও বসবাসযোগ্য নহে। লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা এককথায় খুবই কঠিন। সেই ক্ষেত্রে ন্যায্যমূল্যে খাদ্য সরবরাহ এবং বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাইতে পারে। এইসব বিষয় লইয়া দীর্ঘদিন যাবত্ আলাপ-আলোচনা চলিয়া আসিতেছে। কিন্তু ফলাফল প্রায় শূন্য। এমনকী বেশিরভাগ কারখানায় পূর্ণ বা খণ্ডকালীন কোনো চিকিত্সক পর্যন্ত নাই। উপযুক্ত চিকিত্সকের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা বাধ্যতামূলক করা দরকার। একই সাথে যথাযথ নজর দেওয়া দরকার ব্যাপক ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য-সচেতনতা সৃষ্টির উপর। সচেতনতামূলক কার্যক্রমের উপরই যে স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্যক্রমের সাফল্যের অর্ধেকটাই নির্ভর করে তাহা প্রমাণিত। কিন্তু কাজটি কে করিবে? আর কাজটি হইল কিনা তাহা দেখিবেই বা কে? আমরা মনে করি, সদিচ্ছা থাকিলে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজেএমইএ এবং সরকার যৌথভাবে এই ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখিতে পারে। ইহা তাহাদের দায়িত্বও বটে।
