হেফাজতে ইসলাম বিড়াল না বাঘ ৫ মে টের পাবেন

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৪৩
গতকাল রাজধানীতে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে নেতারা বলেছেন, লেজ গুটানোর অভ্যাস আওয়ামী লীগের আছে, এ দেশের ইসলাম প্রিয় মানুষের নেই। ৫ মে দেখবেন কারা লেজ গুটিয়েছে। হেফাজতে ইসলাম বিড়াল না বাঘ তা ৫ মে টের পাবেন।’ হেফাজত লেজ গুটিয়ে চট্টগ্রাম চলে গেছে’ বলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে হেফাজত নেতারা এই হুমকি দেন। নেতারা সৈয়দ আশরাফ এবং মাহবুব উল-আলম হানিফকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এখনও সময় আছে মুখ সামলে কথা বলুন। না হয় পালাবার পথ পাবেন না। গত ৬ এপ্রিল সারাদেশ থেকে ঢাকা অভিমুখী লং মার্চে সরকার ও সরকার দলীয় ক্যাডারদের তাণ্ডব ও হেফাজতে ইসলাম নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার ও হয়রানির প্রতিবাদে গতকাল সারাদেশে বাদ জুমা দোয়া ও প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। কর্মসূচির অংশ হিসাবে কেন্দ্রীয়ভাবে গতকাল বিকাল ৩ টায় পুরানা পল্টন হাউজবিল্ডিং এর সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে নেতারা আরো বলেন, ৬ এপ্রিল লং মার্চের মহাজনসমুদ্র দেখে সরকার পাগল হয়ে গেছে। এখন তারা আবোল-তাবোল বকছেন। কতিপয় নাস্তিক ব্লগারের উপদেশ না শুনে কোটি কোটি ইসলাম প্রিয় মানুষের কাতারে আসুন। মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতারের নিন্দা জানিয়ে তারা বলেন, তিনি ইসলামের পক্ষে কথা বলায় সরকারের রোষানলে পড়েছেন। অবিলম্বে তাকে মুক্তি না দেয়া হলে জেলের তালা ভেঙ্গে তাকে মুক্ত করে নিয়ে আসা হবে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুরসহ প্রতিটি জেলায় এবং ঢাকা মহানগরীর প্রতিটি থানায় গতকাল বাদ জুমা বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি পালিত হয়েছে। আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হয়েছে শানে রেসালাত মহাসমাবেশ। গতকাল শুক্রবার বাদ জুমা রাজধানীর লালবাগ শাহী মসজিদ থেকে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ ঠেকাতে সকাল থেকে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের উল্টোদিকে হাউজবিল্ডিং এর সামনে হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগর যুগ্ম আহবায়ক মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফির সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা শাহ আহমদুল্ল¬াহ আশরাফ, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতী মুহাম্মদ ফয়জুল্ল¬াহ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ূন কবির, উলামা কমিটির মহাসচিব মুফতী তৈয়্যব, ইসলামী ঐক্যজোট ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা আবুল কাসেম, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা শফিকুদ্দীন, অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল করীম, মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, মাওলানা মুসা বিন ইজহার, মাওলনা জুনায়েদ গুলজার, মাওলানা আব্দুল কাইয়ূম, মাওলানা আলতাফ হোসাইন, মাওলানা রেজওয়ান বারী সিরাজী, মাওলানা ফখরুল ইসলাম, মাওলানা তাসলিম আহমদ, মাওলানা খুরশিদ আলম, মাওলানা নূর হোসেন প্রমুখ। বক্তরা আগামী ৫ মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি সফল করার আহবান জানিয়ে বলেন, হেফাজতে ইসলামের ঘোষিত ১৩ দফা কর্মসূচি এ দেশের কোটি কোটি জনতার প্রাণের দাবি। এ দেশের ১৬ কোটি মানুষ এ দাবির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। এ দফাগুলোকে যারা সংবিধান পরিপন্থি বা মধ্যযুগীয় বর্বরতা বলে তারা এ দেশের মুসলমানদের মনের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে। সরকারের মন্ত্রী এমপিরা যদি সংযত হয়ে কথা না বলে তাহলে এ দেশের ইসলাম প্রিয় জনগণ রাজপথেই তাদের জবাব দিবে। বক্তরা দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার এবং আমার দেশের ছাপাখানায় তল্ল¬াশীর নামে তালা দেয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, মাহমুদুর রহমান দেশের, ইসলামের ও মুসলমানদের পক্ষে কথা বলার অপরাধেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতার করে সরকার এ দেশের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। মাওলানা মাহমদুল্ল¬াহ আশরাফ বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সরকারের সকলেই পাগল হয়ে গিয়েছে। এ সরকারের মাথায় এখন পানি ঢালতে হবে। মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক বলেন, হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন ও ১৩ দফা নিয়ে সরকার জনগণের সাথে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে। সরকারের মনে রাখা উচিত, ধোঁকাবাজি করে পার পাওয়া যাবে না। মুফতী ফয়জুল্ল¬াহ বলেন, সরকার তার কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে, তারা নাস্তিক মুরতাদদের বন্ধু। মুসলমানদের এ দেশে নাস্তিক মুরতাদদের পক্ষের সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেয়া হবে না। হাটহাজারী সংবাদদাতা জানান, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে উদ্ধৃত করে ‘হেফাজতে ইসলাম বিড়ালের মত লেজ গুটিয়ে চলে গেছে’ বলে যে বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। এর সাথে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে আওয়ামী লীগ ও গ্রামবাসীর সংঘর্ষের ঘটনায় হেফাজতে ইসলাম নেতা-কর্মীও জড়িত ছিল বলে কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদেরও প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল শুক্রবার বিকালে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় মহাসচিব প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনগরী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, উলামা-মাশায়েখ ও তৌহিদী জনতা কখনো লেজ গুটাতে জানে না। বরং ক্ষমতার অন্ধমোহে আসক্ত জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতিবিদদেরকেই অনেক সময় লেজ গুটাতে বা অন্যের ছাতায় আশ্রয় নিতে দেখা যায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মোকাবেলায় রাজনীতিবিদদেরকে যে ধরনের বাক্য ব্যবহার করতে দেখা যায়, মন্ত্রীরা দেশের শ্রদ্ধাভাজন উলামা-মাশায়েখদের বিরুদ্ধেও তেমনটি করছেন। যা নিতান্তই হতাশাজনক এবং একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর কাছ থেকে এটা কোন মুসলমানই আশা করে না। আল্লামা জুনায়েদ আরো বলেন, ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিকদের শাস্তির দাবিতে হেফাজতে ইসলামের চলমান আন্দোলনে গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিটি কর্মসূচি নির্ধারিত দিন-তারিখে পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ীই শুরু এবং শেষ হয়েছে। এ পর্যন্ত এর কোনরূপ ব্যত্যয় ঘটেনি। গত ৬ এপ্রিলের সাড়াজাগানো লং মার্চ ও ঢাকায় মহাসমাবেশ কর্মসূচিও পূর্বনির্ধারিত সময়ে শুরু এবং শেষ হয়েছে। একই বিবৃতিতে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে আওয়ামী লীগ ও গ্রামবাসীর সংঘর্ষের ঘটনায় হেফাজতে ইসলাম নেতা-কর্মী জড়িত ছিল বলে কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, বৃহস্পতিবার হেফাজতে ইসলামের ফটিকছড়িসহ বাংলাদেশের কোথাও কোন কর্মসূচি ছিল না। ফটিকছড়ি ভূজপুরসহ বাংলাদেশের কোথাও কোন মিটিং-মিছিল ছিল না। ঘটনার সময় ভূজপুরের কাজিরহাট মাদ্রাসার গেট বন্ধ করে দেয়া হয় এবং ছাত্র-শিক্ষকগণ মাদ্রাসার অভ্যন্তরেই অবস্থান করছিলেন ও যথারীতি ক্লাস চলছিল। সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফটিকছড়ির ভূজপুরের সংঘর্ষের ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মী ও স্থানীয় মাদ্রাসাকে জড়িয়ে সংবাদ প্রচার নির্জলা মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর। তিনি এধরনের মিথ্যা ও উস্কানিমূলক সংবাদ প্রচারের নিন্দা এবং সংশ্লিষ্ট পত্রিকাগুলোকে দুঃখ প্রকাশ করে সংশোধনী ছাপানোর দাবি জানান। এদিকে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা এবং মাসিক মুঈনুল ইসলাম পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মাওলানা মুনির আহমদ জানান, গতকাল শুক্রবার আছরের নামাজের পর উপমহাদেশের অন্যতম বিখ্যাত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রধান জামে মসজিদে হেফাজতে ইসলামের আমির ও মাদ্রাসা মহাপরিচালক দেশের শীর্ষ আলেম পীরে কামেল আল্লামা শাহ আহমদ শফী (দা.বা.) বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ও দেশের শান্তি-সমৃদ্ধি কামনায় এক আবেগময় দোয়া ও মুনাজাত পরিচালনা করেন। জুমার নামাজের পর আল্লামা শাহ আহমদ শফী (দা.বা.) এর এই দোয়া ও মুনাজাতের ঘোষণা দেয়া হলে আছরের নামাজের নির্ধারিত সময়ের অনেক পূর্বেই সুবিশাল ৩ তলা মসজিদ ভবনে মুসল্লী সংখ্যা কানায় কানায় ভরপুর হয়ে যায়। মুনাজাত পূর্ব বয়ানে আল্লামা শাহ আহমদ শফী সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা আপনাদের কাছে কোন রাজনৈতিক ও ক্ষমতার দাবি পেশ করিনি। আমরা শুধু আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল, কুরআন-হাদীস ও ইসলামের ইজ্জত রক্ষার জন্য কিছু দাবি আপনাদের কাছে পেশ করেছি। মুসলমানদের ঈমান-আক্বীদা রক্ষা, মা-বোনদের ইজ্জত-আব্রু ও নিরাপত্তার জন্য দাবি পেশ করেছি। এই দাবিগুলো শুধু উলামা-মাশায়েখদের নয়, দেশের কোটি কোটি মুসলমানের প্রাণের দাবি। অথচ সরকারের মন্ত্রীরা মুসলমানদের অরাজনৈতিক এই ন্যায্য দাবি পূরণ না করে বরং এর বিরুদ্ধে নানা অপবাদ ও সমালোচনা করছেন। আল্লামা শাহ আহমদ শফী (দা.বা.) সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষে বিকাল ৫টা ২০ মিনিটে দোয়া ও মুনাজাত শুরু করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গতকাল শুক্রবার মহাসমাবেশে জেলা হেফাজতে ইসলামের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব বলেছেন, ৫ মে এর মধ্যে ১৩ দফা দাবি না মানলে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হবে। তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও মাহবুবুল আলম হানিফের বক্তব্য নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে বলেন, আলেম ওলামাদের বিরুদ্ধে ৮৫ কোটি টাকার লেনদেনের মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। যারা টাকা ছাড়া কিছুই বোঝে না। তারাই টাকার কথা বলেন। যারা আলেম ওলামাদের চিনেন। তারা আলেম ওলামাদের কথা বলেন। ঢাকা মহানগর আহবায়ক মাওলানা নূর হোসাইন কাশেমী বলেছেন, তাদের ১৩ দফা দাবি ইসলাম এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার আন্দোলন। নাস্তিকদের বিরুদ্ধে শাস্তির সর্বোচ্চ আইন ফাঁসির বিধান পাস করার দাবি জানান তিনি। শহরের পৌর মুক্ত মঞ্চে শানে রেসালত মহাসমাবেশ জেলা হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মনিরুজ্জামান সিরাজীর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তারা সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শাহবাগ বন্ধ করা না হলে দেশে শান্তি আসবে না। শাহবাগ তিলে তিলে সরকারকে ডুবিয়ে দিচ্ছে। বক্তারা আরও বলেন, আমরা নারীদের ঘরে বসিয়ে রাখতে চাই না। তাদের সম্মানজনক কাজে লাগাতে চাই। ইসলাম নারীদের যে অধিকার দিয়েছে আমরা সে অধিকার বাস্তবায়ন চাই। ইসলামও নারীর কাজের বিরোধিতা করে না। আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতারের নিন্দা জানিয়ে বলেন, আগামী ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে তাকে মুক্তি না দেয়া হলে আরো কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মাওলানা আবুল হাসনাত আমিনী, মাওলানা মাঈনুদ্দিন রুহী, মাওলানা নূরুল ইসলাম ওলীপুরী, সিলেটের প্রতিনিধি শাইখুল হাদিস নিজাম উদ্দিন, হবিগঞ্জের প্রতিনিধি মাওলানা মাঈনুল প্রমুখ।