গল্প নয় সত্যি

বাংলা নববর্ষ

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৩, ২০:০৭
মূলত খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে মুঘল আমলে যে সন গণনা শুরু হয়েছিল কালক্রমে সেই গণনা থেকেই বাংলা নববর্ষের সূচনা হয়েছিল। যদিও সম্রাট আকবরের আমল থেকে বাংলা সন গণনার এই আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর বহু আগ থেকেই এতদঞ্চলে এ ধরনের সন গণনার চল ছিল। বিশেষ করে হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারো মাসের হিসেব অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হত গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ ঋতুধর্মী উত্সব হিসেবে পালিত হত এবং এর মূল তাত্পর্য ছিল কৃষিকাজ। ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খজনা পরিশোধ করতে হত। এ কারণে মূলত খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যেই মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন যার প্রেক্ষিতে তত্কালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল¬াহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় কিছুটা পিছিয়ে দিয়ে আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় অর্থাত্ ৫ নভেম্বর, ১৫৫৬ থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হত। এর পর দিন অর্থাত্ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এছাড়া এই দিনের প্রধান আরেকটি ঘটনা ছিল একটি হালখাতা বা নতুন হিসেবের খাতা তৈরি করা। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর বেশ কিছুদিন আর সে অর্থে বৈশাখী উত্সবের উপস্থিতি চোখে না পড়লেও ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে তা আবারও সীমিতভাবে ফিরে আসতে থাকে। বাংলা বর্ষবরণের জন্য ঢাকায় রমনার বটমূলে যে আয়োজন চোখে পড়ে সেটির সূত্রপাত হয়েছিল এ সময়েই। সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন এর প্রতিবাদে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অন্যদিকে এ সময়ে বর্ষবরণের আরেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে যে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন চোখে পড়ে সেটি ব্যপকভাবে শুরু হয় আশির দশকের একেবারে শেষভাগ থেকে।