সমঝোতার বছর হোক ১৪২০

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৫৯
প্রাকৃতিক ঝড়-টর্নেডো খুব একটা না হলেও এবার পুরো চৈত্র জুড়েই ছিল রাজনৈতিক টর্নেডো। একের পর এক হরতাল-অবরোধে বিধ্বস্ত হয়েছিল পুরো মাসটি। চৈত্রের শেষ দিনগুলোতেও রাজনৈতিক অস্থিরতার আশংকা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা কেটেছে স্বাভাবিকভাবেই। তবে শংকা কাটেনি মানুষের মন থেকে। এমন এক অবস্থায় একটু ভিন্ন আঙ্গিকে রাতের অন্ধকার বিদীর্ণ করে নতুন সুর্যোদয়ের মধ্যে আজ এসেছে পহেলা বৈশাখ। বাংলাদেশের মানুষের জন্য ১৪২০ সালটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান অনুসারে এ বছরেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। সংবিধান অনুসারে অগ্রহায়ণ-পৌষে এ নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে জটিলতা এখনও কাটেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে এখনও কোন সুরাহা হয়নি। সরকারি দল আওয়ামী লীগ এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এ ইস্যুতে এখনও পরস্পর বিরোধী অবস্থানে রয়েছে। যদিও গত কয়েকদিন ধরে নানা নেতিবাচক খবরের মধ্যেও দুই একটি ইতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। নববর্ষের দুই দিন আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া পরস্পরের কাছে নববর্ষের শুভেচ্ছা কার্ড পাঠিয়েছেন। নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে সবচেয়ে বেশি যার নাম শোনা যাচ্ছে স্পিকার আবদুল হামিদকে নিয়েও বিরোধী দলে তেমন কোন আপত্তি নেই। জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর এই বৈশাখেই সেই শূন্য পদে নতুন রাষ্ট্রপতি আসিন হবেন। যদিও সংবিধান অনুসারে স্পিকার আবদুল হামিদ এখন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। রাজনৈতিক নানা টানাপোড়নের মধ্যে বাঙালির নতুন বর্ষপঞ্জি শুরুর দিনটিতে আজ উত্সবমুখর হয়ে উঠেছে সারা বাংলাদেশ। আজ সরকারি ছুটি। পত্রিকাগুলো নববর্ষ উপলক্ষে বের করেছে বিশেষ সংখ্যা, টেলিভিশনগুলো প্রচার করছে দিনভর বিশেষ বৈশাখী অনুষ্ঠান মালা। শুধু বাংলাদেশ কেন যেখানেই বাংলা ভাষাভাষি মানুষ আছে সেখানেই আজ আনন্দ উত্সব। এক অমলিন আনন্দের দিন। আড্ডা, আমন্ত্রণ, উচ্ছ্বাসে কেটে যাবে দিনটি। পয়লা বৈশাখ ছাড়া এত বড় সার্বজনীন উত্সবের উপলক্ষ আর নেই। এই উত্সবের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি তার আপন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে জাতিসত্তার পরিচয়কে উপলব্ধি করে গৌরব বোধ করে। আর এ গৌরব থেকেই জেগে উঠা চেতনা বাঙালি জাতিকে সবসময় প্রেরণা জুগিয়েছে আপন অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু থেকে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, কিংবা স্বৈরাচার বিরোধী যেকোন আন্দোলনে। চৈত্র সংক্রান্তি আর পয়লা বৈশাখে আগে গ্রামে মেলা বসত। বাড়ি বাড়ি পিঠা-পায়েশ আর ভাল-মন্দ খাওয়ার ধুম পড়ে যেতো। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন পোশাক কেনার ধুম। শহরে এখন পহেলা বৈশাখে গ্রামের চেয়ে বেশি পান্তা ভাত আর ইলিশ খাওয়ার রেওয়াজ তৈরি হয়েছে। আগে চৈত্র সংক্রান্তিকে ঘিরে বেশি আয়োজন হলেও এখন পয়লা বৈশাখেই তৈরি হয়েছে সব উত্সবের আবহ। রাজধানীতে যারা বসবাস করেন তাদের জন্য বাড়তি পাওয়া রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতি গানের আসর, চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রা, রবীন্দ্র সরোবরে গানের আসর, শহরের নানা স্থানে বৈশাখী মেলা। শহর জুড়ে থাকবে নানা ধরনের খাবারের আয়োজন। পোশাকেও থাকবে বর্ষবরণের বৈচিত্র্য। আনন্দ উত্সবের মধ্য দিয়ে বছরের প্রথম দিনটি উত্যাপনের মধ্য দিয়ে নতুন সালকে বরণ করে নেয়ার রীতি বা রেওয়াজ সর্বত্রই রয়েছে। এদিন একে অপরের জন্য ভাল কামনা করে শুভেচ্ছা পাঠানোর রেওয়াজও বেশ প্রাচীন। এবার নববর্ষে পরস্পরের জন্য শুভকামনাই হোক সকলের প্রার্থনা। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সবাই মিলে এ বছরটিকে সাফল্যের বছর হিসেবে তৈরি করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদী অনেক সুফল হয়ত পেতে পারি আমরা। তাই বাংলাদেশের মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ১৪২০ সালকে আমরা বরণ করতে চাই সম্ভাবনার বছর হিসেবে। সংকট নয় সমঝোতাই হোক এ বছরের শ্লোগান। শুভ নববর্ষ।