ফটিকছড়ির ভুজপুর এখন পুরুষশূন্য, আছে আতংক

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৩, ২২:২৬
ফটিকছড়ির ভুজপুর ইউনিয়নের গ্রামসমূহ পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার ভয়াবহ সহিংস ঘটনার পর পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের অভিযানের প্রেক্ষিতে পুরুষ ও কিশোর-যুবকরা এলাকা ছেড়ে গেছে। ভুজপুর ইউনিয়নের পূর্ব ও পশ্চিম পাশের পাহাড়ি এলাকায় অনেকে আত্মগোপন করেছে। অনেকে শহর কিংবা চট্টগ্রামের বাইরে চলে গেছে। ভুজপুর ইউনিয়নের কাজীর হাটের দোকান-পাট এখনো খোলা হয়নি। ব্যবসায়ীদের মধ্যেও অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। ফটিকছড়ির উত্তরে অবস্থিত কাজীর হাট প্রসিদ্ধ বাজার হিসেবে পরিচিত। গত তিন দিন ধরে বাজারে দোকান-পাট না খোলায় এবং লোকজনের উপস্থিতি না থাকায় অনেক গরীব লোক দারুণ কষ্টের মধ্যে পড়েছেন। বিশেষ করে গ্রামের স্বল্প আয়ের লোকজনের নিত্যদিনের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসার চালানো দায় হয়েছে। গত শুক্রবার রাত আটটায় ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করা হলেও মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা এক প্রকার বন্ধ রয়েছে। কারণ পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় এবং মানুষের স্বাভাবিক কাজ-কর্ম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রশাসন স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রকৃত অপরাধী ছাড়া কাউকে গ্রেফতার করা হবে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গত শুক্রবার রাত থেকে শনিবার পর্যন্ত আরো ৩০ জনকে আটক করলেও ৬ জনকে রেখে বাকি ২৪ জনকে ছেড়ে দিয়েছে। ফলে এ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার সহিংস ঘটনায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ ৪০ জনকে আটক দেখানো হয়েছে। স্থানীয় ভুজপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শামসুদ্দিন ভুঁইয়াকে গতকাল বিকালে ক্লোজ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ভুজপুর থানা আগে থেকে সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পরিস্থিতি এ পর্যায়ে পৌঁছাতো না। তাছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা এটিএম পেয়ারুল ইসলামও পুলিশের বিরুদ্ধে সহিংস ঘটনার ইন্ধন দেয়ার অভিযোগ করেছেন। সংঘর্ষের সময় পুলিশ নিরব ভূমিকা পালন করেছে বলে আহতদের অনেকে অভিযোগ করেছেন। এবিএম পেয়ারুল ইসলামের নেতৃত্বে কয়েকশ মোটর সাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের শোভাযাত্রার ওপর হামলার ঘটনা পূর্ব পরিকল্পিত ছিল কিনা পুলিশ তা তদন্ত করে দেখছে। জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) ফরিদ উদ্দিন এলাকায় থেকে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করার চেষ্টা করছেন বলে জানা যায়। জামায়াত-শিবিরের হরতাল ও নৈরাজ্য বিরোধী এ মোটর শোভাযাত্রা হলেও প্রকৃত অর্থে এটি ছিল পেয়ারুল ইসলামের রাজনৈতিক শো-ডাউন। কারণ পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী কয়েকশ যানবাহনযোগে এ শো-ডাউন ফটিকছড়িতে ইতিপূর্বে দেখা যায়নি। অনেকের অভিমত, এটি ছিল আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পেয়ারুল ইসলামের শক্তি ও সামর্থ্য প্রদর্শন শোভাযাত্রা। তাই শোভাযাত্রাটি দক্ষিণ ফটিকছড়ি থেকে শুরু করে উত্তর ফটিকছড়ি পর্যন্ত প্রদক্ষিণ করে পুনরায় ফটিকছড়ি সদরে পৌঁছার পূর্বক্ষণে সহিংসতায় পড়ে। বিশটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত বিশাল ফটিকছড়ি এলাকায় দীর্ঘকাল ধরে সন্ত্রাসী জনপথ হিসেবে পরিচয় লাভ করেছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েক বছর ধরে এ সহিংসতা অনেক কমে গেছে। তাছাড়া ফটিকছড়ির বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ ফটিকছড়ি এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধ দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে। উত্তর ফটিকছড়ি বিএনপি-জামায়াত প্রাধান্য এলাকা হিসেবে পরিচিত। অপরদিকে দক্ষিণ ফটিকছড়ি এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রাধান্য চলে আসছে। ফটিকছড়ি এলাকায় বেশ কয়েকটি কওমী মাদ্রাসা রয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থনে কাজ করেছে বলে নজির নেই। তবে সম্প্রতি কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নামে ওলামা মাশায়েখদের বিভিন্ন ইস্যুতে সরকার বিরোধী অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। গত বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ সংগঠনের মোটর শোভাযাত্রায় সৃষ্ট সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় জামায়াত-শিবির ও এলাকাবাসীর সাথে কাজীরহাট বড় মাদ্রাসার লোকজনও অংশগ্রহণ করেছে। তবে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী এবং পূর্ব থেকে প্রস্তুতি নিয়ে করা হয়েছে কিনা তা এখনো প্রশাসন নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। তাই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বিএনপি ও জামায়াতের কয়েকজনকে সন্দেহের তালিকায় রেখে পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখছে বলে জানা যায়। স্থানীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও ওই সকল নেতার নাম বলা হচ্ছে। শুক্রবার রাতে নিহতদের দাফন করা হয়েছে। নিহতদের পরিবারের মধ্যে শোকের মাতম চলছে। ইতিপূর্বে ১৬ জন নিখোঁজ রয়েছে বলা হলেও আওয়ামী লীগ নেতা এটিএম পেয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, ১৫ জনকে খুঁজে পাওয়া গেছে। তাদেরকে রামগড় ও মীরসরাই উপজেলা হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে নূর মোহাম্মদ নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে তিনি জানান। ফটিকছড়ির পুরো ঘটনার ব্যাপারে উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে গতকাল চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনের পূর্ব ঘোষণা থাকলেও তা করা হয়নি।