সবার অংশগ্রহণমূলক এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। একইসঙ্গে বিরোধীদলের প্রতি হরতালসহ সবধরনের ধ্বংসাত্মক ও নাশকতামূলক কার্যকলাপ বন্ধ করতে এবং আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করতে বিরোধীদলের নেতৃবৃন্দকে জেল থেকে মুক্ত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বর্তমান বাংলাদেশ: রাজনৈতিক প্রেক্ষিত ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সিপিডি এ আহ্বান জানায়। সিপিডির চেয়ারম্যান ড. রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক, শিক্ষাবিদ মনিরুজ্জামান মিঞা, তরুণ রাজনীতিক ও বিজেপি সভাপতি ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু ও একে আজাদ, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ব্যবসায়ী এবং সরকারি ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। শিরোনামোক্ত বিষয়ে বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশকেও ব্যর্থ রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র চলছে উল্লেখ করে বলেছেন, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে নয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে যে দেশ স্বাধীন হয়েছে সেখানে হেফাজতের ১৩ দফা মানা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, সামরিক শাসকদের যাঁতাকলে রাজনীতি হারিয়ে গেছে। আপনাদের সবার কথায় উঠে এসেছে রাজনীতিকদের হাতে রাজনীতি নেই। রাজনীতি কলুষিত হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমরা যখন রাজনীতিতে পারি না তখন ধর্ম আর ভারত সামনে নিয়ে আসি। সংলাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদল বর্তমানে যে অবস্থানে আছে তাতে সংলাপ সম্ভব নয়। সংলাপের কোনো সম্ভাবনা আমি দেখি না। কারণ সংলাপের কথা হলে আমরা বলব জামায়াতকে বাদ দিয়ে আসুন, আর বিএনপি বলবে এটা সম্ভব নয়।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের এই সংকটময় মুহূর্ত শেষ হবে তখনই যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ হবে। কিন্তু এটা অসম্ভব। কারণ, এ বিচার আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার। তিনি বলেন, আমরা অতিমাত্রায় রাজনীতিবিদ হয়ে যাই। আজকের মতো এ ধরনের অনুষ্ঠানে এসেও যেসব লোক অতিমাত্রার রাজনৈতিক বক্তব্য দেন তা কেবল দলীয় ফোরামে দেয়া যায়। এ ধরনের অনুষ্ঠানে তা কাম্য নয়।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য বলেন, চলমান বিরূপ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্থনীতিতে যে সংকট চলছে তাতে দু’টি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে-রাজনৈতিক সংঘাত থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত রাখার ব্যবস্থা নিতে পারি কিনা এবং দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনীতিতে বিদ্যমান মূল সমস্যার সমাধান করে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি কিনা। প্রথম প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অর্থনীতি সচল রাখতে সরকারের সামনে নীতি-পদক্ষেপের সুযোগ অনেক কম এবং সংঘাতময় রাজনৈতিক অবস্থার কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অচল হয়ে পড়ায় সামস্টিক অর্থনৈতিক নীতিপদক্ষেপ বাস্তবায়নেরও সুযোগ নেই। দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিরোধীদলকে হরতালসহ সবধরনের ধ্বংসাত্মক ও নাশকতামূলক কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে, আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সরকারকে বিরোধীদলের সব নেতাকে জেল থেকে মুক্ত করতে হবে এবং সবার অংশগ্রহণমূলক এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য বলেন, রাজনৈতিক সংঘাত ও নাশকতার কারণে দেশের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। গত দুই মাসে বিদেশি সহায়তার পরিমাণ কমে গেছে, শিল্পঋণের প্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়েছে। পুঁজিপণ্যের আমদানি কমে গেছে। একইরকমভাবে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কমে গেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক তার মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সাড়ে ১৮ শতাংশ রাখার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু ফেব্রয়ারি পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে মাত্র ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে, যা চিন্তার বিষয়। তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগ চাহিদা কমে গেছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর। ব্যাংকে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে ৬২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। রফতানি আয় ক্রমেই কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, হরতাল ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দুর্বল হলে রাজস্ব আয়ও কমে যায়। হরতালের অভিঘাত অর্থনীতিতে মারাত্মকভাবে অনুভূত হচ্ছে। শিল্প, পরিবহন ও খুচরা ব্যবসায় খাত বড় ধরনের চাপের মধ্যে পড়েছে। তিনি বলেন, এসব কারণে মধ্য মেয়াদে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা সংকুচিত হয়ে যাবে।
এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি একে আজাদ বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে বিদেশে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা মারাত্মক ইমেজ সংকটে পড়েছে। তারা ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে একটি ‘রেড জোন’ হিসাবে ঘোষণা করেছে এবং দেশে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। তারা প্রতিনিয়তই জানতে চায় এসব কবে শেষ হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে ওয়ান-ইলেভেন এর মত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, সরকার বিরোধীদলকে প্রতিবাদের মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করতে দিচ্ছে না। তাই সহিংস পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। মানুষের উপর সরকার অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়ালে সহিংসতা আরও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, জাতি এখন পুরোপুরি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে।
