হেফাজতের সাথে আমার যোগাযোগ রয়েছে :এরশাদ

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০১৩, ২২:১৭
জাতীয় পার্টির (এ) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ বলেছেন, ‘হেফাজতে ইসলাম নিয়ে খালেদা জিয়া কি বলেছেন তাতে কিছু যায় আসে না। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি হেফাজতের সাথে আমার যোগাযোগ রয়েছে। আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি, হেফাজতে ইসলাম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিংবা ধ্বংসাত্মক কোনো কাজ করবে না।’ গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কমিটির সদস্য এরশাদ এসব কথা বলেন। বৈঠকে তিন বাহিনীর প্রধানগণ বলেছেন, সশস্ত্র বাহিনী যে কোনো পরিস্থিতিতে শপথ অনুযায়ী সংবিধান সংরক্ষণ করবে। তারা বলেন, সংবিধানের প্রতি অনুগত থেকে নিজেদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালনে সশস্ত্র বাহিনী কখনও পিছপা হবে না। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এম ইদ্রিস আলী সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, হেফাজতে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামী নিয়ে বৈঠকে উত্তপ্ত কথাবার্তা হয়। গতকালের বৈঠকে আলোচনার জন্য তিনটি বিষয় পূর্ব নির্ধারিত ছিলো। এগুলো হচ্ছে—তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ও রায় কার্যকর এবং হেফাজতে ইসলাম। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে কমিটির সভাপতি বলেন, সবকিছু নিয়ে কমিটির সদস্যরা আলোচনা করেছেন। আলোচনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিন বাহিনীর প্রধানগণ উপস্থিত ছিলেন। কমিটির সদস্যদের আলোচনা তারা প্রত্যেকে শুনেছেন। তারা তাদের মতামত দিতে গিয়ে বলেছেন দেশের পরিস্থিতি যাই হোক না কেন সংবিধান ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার বিষয়ে সশস্ত্র বাহিনী অনুগত থেকে দায়িত্ব পালন করবে। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, বৈঠকে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ গত মাসের শেষ সপ্তাহে বগুড়ায় বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার দেয়া বক্তব্যও স্থান পায়। কমিটির সদস্যরা বলেছেন, দেশ পরিচালনা করছে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। দেশে সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রয়েছে। আর এ ধরনের পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া সেনাবাহিনী নিয়ে বগুড়ায় উস্কানিমূলক যে বক্তব্য দিয়েছেন তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সূত্র জানায়, আলোচনার এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভুঁইয়া বলেন, দেশে সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখা ও সংবিধান সংরক্ষণ করার বিষয়ে সেনাবাহিনী অঙ্গীরাবদ্ধ। সেনা প্রধানের পর বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল মোহাম্মদ ইনামূল বারী ও নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল মুহাম্মদ ফরিদ হাবিব একই রকম বক্তব্য রাখেন। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, বৈঠকে বিরোধী দলের হরতালসহ হেফাজতে ইসলামের গত ৬ এপ্রিলের লংমার্চ কর্মসূচি, তাদের ঘোষিত দাবি, বর্তমানে বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত সমাবেশ এবং আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে ঘোষিত কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সময় কমিটির সদস্য জাতীয় পার্টির (এ) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ হেফাজতে ইসলামের পক্ষ নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম নিয়ে খালেদা জিয়া কি বলেছেন তাতে কিছু যায় আসে না। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি হেফাজতের সাথে আমার যোগাযোগ রয়েছে। আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি হেফাজতে ইসলাম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিংবা ধ্বংসাত্মক কোন কাজ করবে না।’ এরশাদের এ ধরনের বক্তব্যের বিরোধিতা করেন উপস্থিত কমিটির অপর সদস্যরা। সূত্র জানায়, হেফাজতে ইসলামের পক্ষ নিয়ে এরশাদ বক্তব্য রাখার পর কমিটির সদস্যরা বিরোধিতার পাশাপাশি প্রশ্ন রাখেন, পবিত্র কোরআনের কোন জায়গায় হেফাজতে ইসলামের কথা রয়েছে? এরশাদ এ প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে নিশ্চুপ থাকেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি এম এ মান্নান বলেন, ‘অনেক রাজনৈতিক দল সংবিধানে সংযোজন ও বিয়োজন করে হাজার বছরের বাঙ্গালীর সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি নষ্ট করেছে। আপনি (এরশাদকে ইঙ্গিত করে) জামায়াতকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।’ এরপরই এরশাদ বক্তব্য দেয়া শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী কোন ইসলামী দল নয়। জামায়াতের সাথে কোন মুসলমান বা মুসলিম গোষ্ঠী কিংবা দলের কোন সম্পর্ক নেই।’ এরশাদ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়েও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের ডা. ইমরান কে যে তার নির্দেশ মানতে হবে? গণজাগরণ মঞ্চের বিপরীতে হেফাজতে ইসলাম তৈরি হয়েছে।’ পহেলা বৈশাখে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রারও সমালোচনা করেন এরশাদ। তিনি কমিটির সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি দুই নেত্রীকে চিঠি দিয়েছি। চিঠির বিষয় হচ্ছে কি পন্থায় নির্বাচন হবে সে সম্পর্কে। তাদের সংলাপে আমি নিজে উপস্থিত থাকবো।’ কমিটির সভাপতি তার বক্তব্যে বলেন, ইসলাম ধর্মের হেফাজতকারী একমাত্র আল্লাহ, হেফাজতে ইসলাম নয়। যাদের ঈমান দুর্বল তারা মনে করে ইসলামের হেফাজত করবে হেফাজতে ইসলাম। যারা হেফাজতে ইসলামের কথা বলেন তাদের উদ্দেশ্যে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ঈমানের দুর্বলতায় বিচলিত হয়ে উন্মাদনা সৃষ্টি এবং ইসলাম হেফাজত করার দায়িত্ব তাদেরকে কে দিয়েছে? সূত্র জানায়, বৈঠকে কমিটির সদস্যরা বলেছেন, বর্তমানে যে ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা থেকে উত্তরণ সম্ভব। সদস্যরা মনে করেন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো যাবে। তবে তারা যে কোনোভাবেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়া যেন চালু থাকে সেদিকে নজর রাখার বিষয়ে সুপারিশ করেন। কমিটির আগের বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েও গতকালের বৈঠকে আলোচনা করা হয়। কমিটির সদস্যরা গত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে সরকার উত্খাতের অপচেষ্টার সঙ্গে জড়িত পলাতক ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার পরামর্শ দেন। কমিটির সদস্য নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, মঞ্জুর কাদের কোরাইশীও বৈঠকে অংশ নেন। এছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।