মঙ্গল শোভাযাত্রার রজতজয়ন্তী

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০১৩, ২২:১৮
বাংলা বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা রজতজয়ন্তী পূর্ণ করল। দেশের মঙ্গল শোভাযাত্রার পথিকৃত্ যশোরের চারুপীঠ এবার শোভাযাত্রার রজতজয়ন্তী পালন করেছে। বাংলা নববর্ষের প্রথম প্রহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালি সংস্কৃতির অনিবার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। নতুন বছরের প্রভাতে শোভাযাত্রা ছাড়া নববর্ষ উত্সব এখন আর ভাবাই যায় না। সারা দেশের এই মঙ্গল শোভাযাত্রার সূতিকাগার প্রাচীন ঐতিহ্যের শহর যশোর। যশোরের চারুপীঠ ১৯৮৬ সালে প্রথমবারের মতো বর্ণময় এ উত্সবের স্বপ্নীল সূচনা করে। যশোরের আঁকিয়েদের সংগঠন চারুপীঠের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মাহবুব জামাল শামীম পরিকল্পনা করেন নতুন উত্সব আয়োজনের। নববর্ষের প্রথম প্রহরের সে উত্সব হবে লোকজ ঐতিহ্যের সম্মিলনে—যে উত্সব হবে সকলের। সে অনুষ্ঠানে যিনি দর্শক, তিনিই শিল্পী। সব মিলিয়ে সে অনুষ্ঠান হবে সব বয়সের, সব শ্রেণী-পেশার মানুষের প্রাণের উত্সব। এমন লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে শামীম উদ্যোগ নেন কিছু করার। সামনে থেকে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করেন হিরণ্ময় চন্দ্র। শুরুর কথা বলতে গিয়ে ২৫ বছর অতীতে ফিরে যান মাহবুব জামাল শামীম। তিনি জানান, পরিকল্পনা মাফিক চারুপীঠের ৩শ’ শিক্ষার্থীকে এক মাস প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। যশোর সাহিত্য পরিষদের ৫০ জন সদস্যও অংশ নেন প্রশিক্ষণে। ১৩৯৩ বঙ্গাব্দের সেই প্রথম প্রহরে যখন থেকে ঢোলে বাড়ি পড়ে, তখন এক নতুন বিনোদন অনুষঙ্গের সূচনা হয়। যাত্রা শুরুর অভিব্যক্তি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান, সেই ঢাকের তরঙ্গায়িত শব্দের মাধ্যমে যেন প্রবাহিত হতে থাকে আনন্দের ফল্গুধারা। ফুল, পাখি, হাতি, ঘোড়া, প্রজাপতিসহ লোকজ ঐতিহ্যের নানা উপকরণ নিয়ে নেচে গেয়ে শুরু হয় সেই মঙ্গল শোভাযাত্রা। প্রথম আয়োজনেই সে শোভাযাত্রা বাংলা নববর্ষের উত্সবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। পরের বছর সে অনুষ্ঠান আরও ব্যাপ্তি লাভ করে। যশোরের সর্বস্তরের মানুষ এক কাতারে নেমে এসে অংশ নেন মঙ্গল শোভাযাত্রায়। ১৩৯৪ বঙ্গাব্দের প্রথম প্রহরের মঙ্গল শোভাযাত্রার পর অতিথি সেবার জন্য চারুপীঠ তিন হাজারেরও বেশি পিঠা তৈরি করেও সংকুলান করতে পারেনি। মঙ্গল শোভাযাত্রার সেই শুরু যশোরে। আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর মাহবুব জামাল শামীম উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে চারুকলার শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিকল্পনা করেন মঙ্গল শোভাযাত্রার। সে অনুযায়ী ১৩৯৬ বঙ্গাব্দে ঢাকার চারুকলা বিভাগ থেকে শুরু হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। পরের বছর তা ময়মনসিংহ ও বরিশালে এবং এরপর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে লোকজ ঐতিহ্যের স্মারক সম্মিলন মঙ্গল শোভাযাত্রা। সে অনুষ্ঠান আজ সারা দেশের, সব মানুষের। আর সার্বজনীন এই উত্সবের সূতিকাগার যশোর। সেই নবতর যাত্রার অগ্রপথিক চারুপীঠ এবার এই অনুষ্ঠানের রজতজয়ন্তী পালন করেছে। ২৫তম মঙ্গল শোভাযাত্রা বর্ণময় হয়ে ওঠে হাতি, ঘোড়া, বাঘ, শিয়ালের বিশালকায় প্রতিকৃতিতে। চারুপীঠের রজত জয়ন্তীর মঙ্গল শোভাযাত্রা যশোরের সার্বজনীন উত্সবে পরিণত হয় বলে জানালেন চারুপীঠের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এঞ্জেলিকা কেকা ডায়েস ও শিল্পী ওবায়েদ জাকি রাসু। একান্ত আলাপচারিতায় চারুপীঠের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মাহবুব জামাল শামীম জানান, তিনি শিল্পের সামাজিকায়ন চান। জড়তামুক্ত ও শিল্পিত সমাজ গঠনে নিজস্ব কৃষ্টি-কালচারকে পরিচর্যা ও লালন করতে হবে। আর এসব লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বাংলার ঐতিহ্য এবং সব শিল্পের সমন্বয়ে যাত্রা শুরু করে মঙ্গল শোভযাত্রা। চারুপীঠ অঙ্গনে ২৫ বছর আগে বপন করা সেই বীজ আজ মহীরুহ।