ছায়ানট এবারের পহেলা বৈশাখের আয়োজনে ছড়িয়ে দিয়েছে স্বদেশপ্রেমের আকুতি। গানে, আবৃত্তিতে শিল্পীরা তুলে এনেছেন বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও প্রতিবাদমুখর সময়কে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তানি আমলে বাঙালির আন্দোলনমুখর দিন এবং মুক্তিযুদ্ধ। গানের সুরে ও কবিতার পংক্তিমালায় সেসব দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ছায়ানট জানাতে চাইলো সময়ের প্রয়োজনে আবারো একজোট হয়ে প্রতিবাদ করার সময় এসেছে। মঞ্চজুড়ে লাল-সবুজের আবহ আর প্রতিবাদী গানে- কবিতায় ছায়ানটের আয়োজনে তাই বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, ছিল সামপ্রদায়িক অপশক্তিকে প্রতিরোধেরও আহ্বান।
দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা/কারো দানে পাওয়া নয়
দাম দিচ্ছি প্রাণ লক্ষ কোটি/জানা আছে জগত্ময়।
পুরো আয়োজনেই আব্দুল লতিফের এই গানটি বারবার এসেছে। মনে করিয়ে দিয়েছে কত রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই বাংলাদেশ আজো বিভক্ত। গানে গানে শিল্পীরা যেন সেই বিভক্তি অপসারণের জন্য আন্দোলনেরই ডাক দিচ্ছিলেন।
পহেলা বৈশাখে নতুন বছরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রমনা বটমূলে শুরু হয় ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠান। শুরু হয় বাঙালির বর্ষবরণ। শিল্পীরা গানে গানে অশুভের বিনাশ ঘটিয়ে মানব কল্যাণের আহ্বান জানালেন। রমনা বটমূলে নেমেছিল মানুষের ঢল। বৈরী পরিবেশে ১৯৬৭ সাল থেকে শুরু হয়ে প্রায় পাঁচ দশক ধরে চলে আসা ছায়ানটের এ অনুষ্ঠান আর বর্ষবরণ আজ সমার্থক হয়ে উঠেছে। সে কারণে পহেলা বৈশাখে মানুষের স্রোত শুরু হয় এ অনুষ্ঠানকে ঘিরেই। এ বছরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।
অনুষ্ঠান শেষে ছায়ানট সভাপতি সন্জীদা খাতুন তার বক্তৃতায় বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বকাল থেকে ছায়ানট সাধনা করে এসেছে স্বাধিকারের জন্য। পঞ্চাশ বছর পর আজো স্বাধিকারের, সংস্কৃতি চেতনার সাধনা করে চলতে হচ্ছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, সংস্কৃতির চেতনায় আমাদের পথ চলা সবাইকে আলোকিত করতে পারেনি। বিএ, এমএ পাস করা তো আর শিক্ষা নয়। শিক্ষাকে নিতে হবে অন্তরে। শিক্ষাকে অন্তরে ধারণ না করলে আমাদের স্বাধীনতা বারবার বাধাগ্রস্ত হবে। শিক্ষার অভাবেই স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির চেতনা অন্ধ, যা তাদের নানাভাবে বিভ্রান্ত করে চলেছে। এই বিভ্রান্তি থেকে তারা হিংসা, হানাহানিতে লিপ্ত হয়েছে। কবি বলেছেন, যারা চুপ করে থাকেন তাদের তিনি ঘৃণা করেন। তাই এদের রুখতে শিক্ষিত সমাজকেই দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা যারা সংস্কৃতির চর্চা করি আমাদের ওপর অনেক দায়িত্ব। আমরা গঠনমূলক কাজের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষকে সচেতন করে তুলতে পারি। আমরা বাংলাদেশকে বারবার অপশক্তির কাছে পরাজিত হতে দেব না। এ দায়িত্ব আমার, আপনার সবার। বাংলাদেশে সুদিন আসবেই।
বরাবরের মতোই ভোর সোয়া ৬টায় সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর রমনা বটমূলে শুরু হয় ছায়ানটের বর্ষবরণের আয়োজন।
শিল্পী আলমাস আলী, মো. মনিরুজ্জামান ও অসিত বিশ্বাসের বেহালা-বাঁশি-এস্রাজে ‘রাগ ললিতের’ মধ্য দিয়ে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর সমবেতকণ্ঠে কবিগুরুর গান ‘আলো যে ওই যায় রে দেখা ওরে আলো’। এরপর শিল্পী ইলোরা আহমেদ শুক্লা গেয়ে শোনান রবীন্দ্র সংগীত ‘প্রথম আলোর চরণধ্বনি উঠলো বেজে যেই’। সেঁজুতি বড়ুয়া শোনান রবীন্দ্র সংগীত ‘তোর ভিতরে জাগিয়া কে যে তারে বাঁধনে রাখিবি বাঁধি’, আর খায়রুল আনাম শাকিল শোনান নজরুল সংগীত ‘ভোরের হাওয়া এলে ঘুম ভাঙাতে কী’।
সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’, শামসুর রাহমানের ‘দুখিনী বর্ণমালা’, হেলাল হাফিজের ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’, সিকান্দার আবু জাফরের ‘বাংলা ছাড়ো’, নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘এই মৃত্যু-উপত্যকা আমার দেশ না’, কবি জীবনানন্দ দাশের ‘অদ্ভুত আঁধার এক’-এর মতো প্রতিবাদী কবিতা উত্সবমুখর জনতাকে মনে করিয়ে দেয় লড়াই এখনো শেষ হয়নি। অনুষ্ঠানে গাওয়া হয় আব্দুল লতিফের ‘আমি দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা’, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র ও সনত্কুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘যশোর বগুড়া, পাবনা ঢাকা বরিশাল নোয়াখালী’, গৌরিপ্রসন্ন মজুমদারের ‘মা গো ভাবনা কেন, আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে’, আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘শহীদ মিনার ভেঙেছে আমার’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় অনুষ্ঠান।
