ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১২ই আশ্বিন ১২২৭ সাল) ১৮২০ খ্রী: ২৬শে সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বংশীয় পদবী ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়। বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঠাকুরদা রামজয় তর্কভূষণ।
রামজয়ের পন্ডিত হিসেবে খ্যাতি থাকলেও তাঁর পারিবারিক অবস্থা ছিল অসচ্ছল। ভাইয়ের সঙ্গে মনোমালিন্য দেখা দিলে রামজয় একদা গৃহত্যাগ করে অন্যত্র চলে যান। ফলে তাঁর স্ত্রী দুর্গাদেবী পুত্রকন্যা নিয়ে খুবই দুরবস্থায় পড়েন। অবশেষে দুর্গাদেবী পুত্রকন্যা নিয়ে পিত্রালয়ে বীরসিংহ গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হন। তাই বীরসিংহ গ্রাম ঠাকুরদাসের মামাবাড়ি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরচন্দ্রের আপন দেশ হয়ে দাঁড়ায়। ঠাকুর দাস অত্যন্ত সত্, তেজস্বী ও স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন। এই সব গুণাবলী পুত্র ঈশ্বরচন্দ্রের মধ্যেও ফুটে ওঠে।
অনুমানিক তেইশ চব্বিশ বছর বয়সে গোঘাট নিবাসী রামকান্ত তর্কবাগীশের কন্যা ভগবতী দেবীর সঙ্গে ঠাকুরদাসের বিবাহ হয়। ইশ্বরচন্দ্র ছিলেন তাঁদের জ্যেষ্ঠ সন্তান। দারিদ্র্যের মধ্য দিয়েই ঈশ্বরচন্দ্রের বাল্য জীবন অতিবাহিত হতে থাকে। পাঁচ বছর বয়সে বীরসিংহ গ্রামের কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের পাঠশালায় বালক ঈশ্বরচন্দ্র ভর্তি হন। যেখানে তিনি প্রায় আট বছর লেখাপড়া করেন। এরপর ১২৩৫ সালে পুত্র ঈশ্বরচন্দ্রকে ঠাকুরদাস কলকাতায় নিয়ে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন। তখন তাঁর বয়স নয় বছর। প্রথমে ভর্তি হলো ব্যাকরণের তৃতীয় শ্রেণীতে। দেড় বছর পড়ার পর মাসিক পাঁচ টাকার একটি বৃত্তি পান। ব্যাকরণের ছাত্র থাকা অবস্থায় পর পর তিনটি বার্ষিক পরীক্ষায় বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে পারিতোষিক পেয়েছিলেন। এরপর ১৮৩০ খ্রী. তিনি ভর্তি হলেন ইংরেজি শ্রেণীতে। সেখানেও তিনি বিশেষ কৃতিত্বের জন্য পুরস্কার পেয়েছিলেন। ১৮৩৩ খ্রী:-১৮৩৫ খ্রী: পর্যন্ত তিনি সাহিত্য শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। এ সময় তিনি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন জয়গোপাল তর্কালংকারকে। ১৮৩৪-৩৫ খ্রী: বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে কিছু উল্লেখযোগ্য বই পুরস্কার পান। এর পর তিনি ১৮৩৫ খ্রী: ভর্তি হলেন অলঙ্কর বিষয়ক শাস্ত্রে। অধ্যাপক হিসেবে পান বিখ্যাত পন্ডিত প্রেমচাঁদ তর্কবাগীশকে। এক বছর এই শ্রেণীতে তিনি লেখাপড়া করেন। এরপর ১৮৩৬ খ্রী:-১৮৩৯ খ্রী:-এর মধ্যে পড়েছিলেন বেদান্ত শ্রেণী ও স্মৃতি শ্রেণীতে। এইসব শ্রেণীতে শিক্ষকরূপে পেয়েছিলেন শম্ভুচন্দ্র বাচস্পতি, হরনাথ তর্কভূষণ প্রমুখ বিখ্যাত পন্ডিতদের। এর মধ্যে ১৮৩৯ খ্রী: উত্তীর্ণ হন হিন্দু ল কমিটির পরীক্ষায়। সবশেষে পাঠ সমাপ্ত করে ন্যায় শ্রেণী ও জ্যোতিষ শ্রেণীতে পড়ে।
আনুমানিক এগারো বছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্রের বিবাহ হয় দিনময়ী দেবীর সঙ্গে। দিনময়ীর পিতা ছিলেন ক্ষীরপাই গ্রাম নিবাসী শত্রুঘ্ন ভট্টাচার্য। ১৮৪১ খ্রী: ২৯শে ডিসেম্বর কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রথম পন্ডিতের পদের মাধ্যমে ঈশ্বরচন্দ্রের কর্মজীবন শুরু হয়। তখন তাঁর মাসিক বেতন ছিল ৫০ টাকা। উক্ত কলেজের সেক্রেটারী জি.টি. মার্শাল সাহেবের বিশেষ সুপরিশে অল্পবয়সে ঈশ্বরচন্দ্র এ কাজটি পেয়েছিলেন। এখানে চাকরির ফাঁকে ফাঁকে ভাল করে শিখে নিলেন ইংরেজি ও হিন্দি ভাষা। এখানে তিনি কাজ করেছিলেন পাঁচ বছর। ১৯৮৪ খ্রী: ৬ই এপ্রিল বিদ্যাসাগর সংস্কৃতি কলেজে যোগ দেন সহকারী সম্পাদকের পদে।
১৮৫১ খ্রী: সৃষ্ট হয় সংস্কৃত কলেজে অধ্যক্ষের পদ। বিদ্যাসাগরের বিশেষ দাবিতে এই পদটি সৃষ্টি হয়েছিল। ইতিমধ্যে তিনি ১৮৫০ খ্রী: ৪ঠা ডিসেম্বর এ কলেজের সাহিত্য শাস্ত্রের অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। এরপর ১৮৫১ খ্রী: ২২শে জানুয়ারি মাসিক ১৫০ টাকা বেতনে তিনি নিযুক্ত হন অধ্যাপক পদে। ১৮৫৪ খ্রী: ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ ভেঙে তৈরি হল বোর্ড অব-একজামিনার্স। বিদ্যাসাগরকে এই বোর্ডের একজন সদস্য করা হল। হ্যালিডের উদ্যোগে ও সরকারি নির্দেশে স্থির হল বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হবে ডিরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশনের মাধ্যমে। তদারকের ভার থাকবে পরিদর্শক বিদ্যাসাগরের উপর। হ্যালিডের আগ্রহে বিদ্যাসাগর নিযুক্ত হলেন দক্ষিণ বাংলার বিদ্যালয়গুলোর সহকারী ইনস্পেক্টর পদে। জেলায় জেলায় বিদ্যালয় স্থাপন করতে শুরু করলেন। নবীন শিক্ষার্থীদের জন্য রচনা করতে লাগলেন কালজয়ী পাঠ্যপুস্তকসমূহ। ১৮৫৬ এর মধ্যেই তাঁর এলাকার প্রতি জেলায় ৫টি করে বিদ্যালয় স্থাপন করলেন তিনি। এরই পাশাপাশি ঈশ্বরচন্দ্র ব্যস্ত হলেন স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের জন্য। কঠোর পরিশ্রম করে তিনি ১৮৫৭ খ্রী: এর মধ্যে হুগলী, বর্ধমান, মেদিনীপুর ও নদীয়া জেলায় পঁয়ত্রিশটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সে চাকরি ছাড়লেও ঈশ্বরচন্দ্র একেবারে বেকার হয়ে থাকলেন না। ইতিমধ্যে বই লেখা ও বই ছাপানোর কাজে তাঁর বেশ আয় হত। নিজস্ব প্রেসও ছিল। এর মাধ্যমে তিনি যথেষ্ট ধনশালী হতে পেরেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অক্ষয় কীর্তি তাঁর সমাজ সংস্কার। তাঁরই উদ্যোগে বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়। বহুবিবাহের বিরুদ্ধে আজীবন আন্দোলন করেছেন।
১৮৮০ খ্রী: ভারত সরকার, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে মি. আই. ই. উপাধিতে ভূষিত করে। তারও আগে ১৮৬৪ খ্রী: তিনি ইংল্যান্ডের রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। জীবনের শেষ দিকে বিদ্যাসাগরের স্বাস্থ্য নানা কারণে ভেঙে পড়ে। পারিবারিক জীবনে তিনি বিশেষ শান্তি পাননি। পরিচিত কিছু কাছের বন্ধুরাও তার সংগে করেছিল প্রতারণা। এইসব নানাবিধ কারণে শেষ জীবনে তিনি সাঁওতাল পরগণার কামাটারে বসবাস করছিলেন। সাঁওতালদের অনাড়ম্বর সরল জীবন যাপনে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাদের জন্য একটি বিদ্যালয়ও করে দিয়েছিলেন। ভগ্নস্বাস্থ্যের আর উন্নতি না হওয়ায় ১৮৯১ খ্রী: ২৯ জুলাই তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটে। বিদ্যাসাগরের স্মরণে ১৮৯১ খ্রী: ২৭শে আগস্ট কলকাতায় টাউন হলে একটি মহতী শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন ছোটলাট স্যার চার্লস এলিয়ট। তাঁর মর্মরমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয় সংস্কৃত কলেজ ভবনে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রায় সমগ্র রচনায় শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের কথা ফুটে উঠেছে। এখানে তাঁর রচনাবলীর নাম উল্লেখিত হল:
বেতাল পঞ্চবিংশতি, বাঙ্গালার ইতিহাস-২য় ভাগ, জীবনচরিত, বোধোদয়-শিশুশিক্ষা চতুর্থ ভাগ, সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমনিকা, ঋজুপাঠ- প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, তৃতীয় ভাগ, ব্যাকরণ কৌমুদি: প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, তৃতীয় ভাগ, ও ৪র্থ ভাগ। সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্য বিষয়ক পুস্তক শকুন্তলা, বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব, বর্ণ-পরিচয় প্রথম ভাগ ও দ্বিতীয় ভাগ, বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ে প্রস্তাব- দ্বিতীয় পুস্তক, কথামালা, চরিতাবলী, মহাভারত-উপক্রমণিকা ভাগ, সীতার বনবাস, আখ্যানমঞ্জুরী, শব্দমঞ্জরী, ভ্রান্তিবিলাস, বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ে বিচার, বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ে বিচার-দ্বিতীয় পুস্তক, পদসংগ্রহ: প্রথম ভাগ ও দ্বিতীয় ভাগ, নিষ্কৃতি লাভ প্রয়াস, সংস্কৃত রচনা, শ্লোকমঞ্জরী, বিদ্যাসাগর চরিত-স্বরচিত, ভূগোল খগোল বর্ণনম, বেনামে প্রকাশিত হয়েছিল নিম্নলিখিত রচনাসমূহ: অতি অল্প হইল, আবার অতি অল্প হইল ব্রজবিলাস, বিধবা বিবাহ ও যশোহর হিন্দুধর্মরক্ষিণী সভা, রত্নপরীক্ষা।
এছাড়াও ঈশ্বরচন্দ্র সম্পাদনা করেছিলেন বেশকিছু গ্রন্থ। আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সংগে স্মরণ করি।
