ইফতি আকবর তাওসিফ ও মুশফিকুর রহমান দুজনই শিক্ষক পিতার সন্তান। দুজনই অসময়ে হারিয়েছেন পিতাদের। তার মাঝে তাওসিফ ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষা চলাকালীন আর মুশফিক তার বাবাকে হারিয়েছেন জেএসসি পরীক্ষা চলাকালীন। কিন্তু কঠিন সময়ে বাবাদের হারিয়ে সৃষ্টি হওয়া শূণ্যতা তাদের দমাতে পারেনি। তারা দুজনই এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে।
এর মাঝে ইফতি আকবর তাওসিফ কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আর মুশফিকুর রহমান চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল হতে জিপিএ-৫ পেয়েছে।
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ৭ ফেব্রুয়ারি ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা ছিল তাওসিফের। ওইদিন ভোরেই তার বাবা নাজিম উদ্দিন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। সকাল নয়টার দিকে পেকুয়া উপজেলার পূর্ব গোঁয়াখালীর নিজ বাসভবনে আসে নাজিম উদ্দিনের মরদেহ। নাজিম উদ্দিন পূর্ব গোঁয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।
১০টায় পরীক্ষা। তাই বাবার মৃত চেহারাটা একনজর দেখেই পরীক্ষার হলে চলে যায় তাওসিফ। মনে নীরব কান্না নিয়েই পরীক্ষা শেষ করে বাবাকে দাফন করা তওসিফ ৬ মে ঘোষিত ফলাফলে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে।
আরও পড়ুন: হত্যা মামলার আসামির দুই পা কেটে বিচ্ছিন্ন
চার ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় তাওসিফ এর আগে জেএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ সহ বৃত্তি পেয়েছিল। তার বড় ভাই ফয়জুল আকবর তোয়াহা চট্টগ্রাম বিএএফ শাহীন কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে ও তৃতীয় ভাই তাহফিমুল আকবর চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। সবার ছোট ভাই ইসরাক বিল্লাহর বয়স মাত্র চার বছর।
জিপিএ-৫ পাওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে তাওসিফ বলে, বাবা ক্লাসে সব সময় বলতেন, বাড়িতে কেউ মারা গেলে তার লাশ এক পাশে রেখেও ক্লাসে যেতে হবে, পরীক্ষা দিতে হবে। বাবার সেই কথাটি আল্লাহ আমাকে দিয়েই বাস্তবায়ন করেছেন। জীবিত বাবার চেয়ে মৃত বাবা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন বেশি। আমি কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়েছি, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। বাবা বেঁচে থাকলে খুবই খুশি হতেন। আল্লাহ বাবার আত্মা সুখী রাখুক।
অপরদিকে, কক্সবাজারের চকরিয়ার শাহারবিল মাইজঘোনা এলাকার বাসিন্দা ও কক্সবাজার সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান প্রফেসর মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনের ছেলে মুশফিকুর রহমান তার বাবাকে হারান ২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট। তখন তিনি (মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন) চট্টগ্রাম সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এদিন ভোরে হঠাৎ তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দুই ছেলে দুই মেয়েকে অসহায়ভাবে রেখে পরপারের বাসিন্দা হন। বাবাকে হারানোর বছরই মুশফিকুর রহমান বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় হতে জিপিএ-৫সহ বৃত্তি পেয়ে জেএসসি পাস করে।
এবার চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল হতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সব বিষয়ে এ-প্লাস নিয়ে ১২২৭ নম্বর পেয়ে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। ২০১৩ সালে কক্সবাজারে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে জিপিএ-৫সহ বৃত্তি নিয়ে পিএসসি পাস করে মুশফিক। মুশফিকের দাদা মাস্টার জিন্নাত আলী মাইজঘোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।
গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে মুশফিকুর রহমান বলে, বাবা অন্য শিক্ষার্থীদের মতো আমাদেরও শিক্ষক এবং পথ প্রদর্শক ছিলেন। কিন্তু অসময়ে তাকে আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে নিয়ে গেছেন। চারপাশ এখন বড় শূণ্য লাগে। বাবা মারা যাবার পর আমার মা এশরাক জাহান জেসমিন আমাদের গতি যেন শ্লথ না হয় সেই প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। বাবার শূণ্যতার মাঝে মায়ের সেই প্রচেষ্টার ফসল আমার গোল্ডেন জিপিএ-৫। মায়ের কামনা বাবার যোগ্য উত্তরসূরী হয়ে উঠা। এ সফলতার জন্য সবার দোয়া চাচ্ছি
ইত্তেফাক/জেডএইচ
