শ্রেণিকক্ষে আসলে কী হচ্ছে

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৪৪
আমাদের জন্য এটা খুব ইতিবাচক যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে সর্বাধিক বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন, ২০১২ সালে সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন এবং নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে ২০১৩ সালে সম্পূর্ণ নতুন পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন বিষয় যুক্ত (যেমন জীবন ও কর্মমুখী শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ ইত্যাদি) করা হয়েছে। এছাড়া গত কয়েক বছরে দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বৃদ্ধি পেয়েছে, মেয়েদের অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে, দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক প্রদান করা হচ্ছে। শিক্ষার পেছনে এত অর্থ ,পরিশ্রম ,ত্যাগ ও সাধনা ব্যয় করা হচ্ছে শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের ভালো ও কার্যকর শিক্ষার জন্য। কিন্তু আমরা জানি না যে আমাদের এত বিনিয়োগ আসলে কতটুকু কার্যকর হচ্ছে। আমরা শুধু বাইরে থেকে শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন ধরনের ইনপুট দিচ্ছি যেমন নতুন শিক্ষানীতি, শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক ইত্যাদি। কিন্তু আমরা জানি না আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলোতে আসলে কী হচ্ছে। ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ Paul Black এবং Dylan Wiliam আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলোকে কালো বাক্সের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেখানে বাইরে থেকে কতকিছুই না ইনপুট দেওয়া হচ্ছে কিন্তু বাহ্যিকভাবে দেখার উপায় নেই যে এই ইনপুটগুলো কতটা কার্যকরভাবে প্রসেসিং হচ্ছে । কিন্তু আমি মনে করি এখনই আমাদের সময় এসেছে (হাই টাইম) এ বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবার। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় বছরে দুটি সাময়িক ও একটি বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে গ্রেড বা নম্বরের মাধ্যমে ফলাফল প্রদান করা হচ্ছে । অথবা পাস বা ফেল দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের শিখন অগ্রগতি। যা দেখে বোঝার উপায় নেই যে আদতে শিক্ষার্থী কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের কোন নির্ধারিত অংশে ভালো বা খারাপ করেছে। কোন নির্ধারিত অংশে ভালো করার কারণে ভালো গ্রেড বা নম্বর পেয়েছে। অথবা কোন নির্ধারিত অংশে খারাপ করার কারণে খারাপ গ্রেড বা নম্বর পেয়েছে। ফলে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায় যে এ পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের শিখন সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য প্রদান করে না। এর ফলে শিক্ষকও এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না । এতে শিক্ষার্থীরা কিছু না শিখেই পরবর্তী ক্লাসে চলে যায়। এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রয়োজন গাঠনিক মূল্যায়ন। গাঠনিক মূল্যায়ন হচ্ছে এমন একটি মূল্যায়ন ব্যবস্থা যার মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষণ শিখন কার্যক্রম চলাকালে শিক্ষার্থীদের শিখন অগ্রগতি যাচাই করা হয় এবং প্রাপ্ত তথ্য শিক্ষার্থীর সমস্যা সমাধানে কার্যক্রম নির্ধারণে ব্যবহার করা হয়। অর্থাত্ গাঠনিক মূল্যায়ন হচ্ছে একটি চলমান মূল্যায়ন ব্যবস্থা যার মাধ্যমে শিক্ষণ শিখন কার্যক্রম চলাকালে শিক্ষার্থীদের শিখন অগ্রগতি সম্পর্কে ফিডব্যাক প্রদান করা হয় এবং এই ফিডব্যাকের আলোকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে মৌখিক প্রশ্নোত্তর, কুইজ, পর্যবেক্ষণ, অ্যাসাইনমেন্ট ও বাড়ির কাজ প্রদান করতে পারেন এবং ফিডব্যাক প্রদান করতে পারেন। এর ফলে শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষেই তার সমস্যা সমাধানের সুযোগ পায়। তার সাফল্য ও ব্যর্থতা সম্পর্কে জানতে পারে এবং সে আত্মসক্রিয় হয় । যা তাদের মধ্যে শিখনের আগ্রহ, মনোযোগ ও প্রেষণার সৃষ্টি করে এবং পরীক্ষা ভীতি দূর করে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায় এবং শিখন পরিবেশ হয় বন্ধুত্বপূর্ণ। আর অন্যদিকে একজন শিক্ষকও তাঁর শিক্ষণ কার্যক্রমের সাফল্য ও ব্যর্থতা সম্পর্কে জানতে সক্ষম হন। পাঠের কোন অংশে তিনি সফল বা ব্যর্থ হয়েছেন, শিক্ষণ পদ্ধতি বা কৌশল নির্বাচন ঠিক হয়েছে কীনা এবং তিনি সঠিক শিক্ষা উপকরণ নির্বাচন করতে পেরেছেন কীনা তাও জানা হয়ে যায় তাঁর। এর ফলে চূড়ান্ত মূল্যায়নের আগেই শিক্ষক বিভিন্ন ধরনের দুর্বলতা বা সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারেন। এই মূল্যায়ন ব্যবস্থায় শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সবল ও দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ফিডব্যাক প্রদান করতে পারেন বলে শিক্ষণ খুবই কার্যকর হয়। সুতরাং এখনই সময় এসেছে আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে গাঠনিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা কার্যকর করার। গাঠনিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করার জন্য অতিরিক্ত তেমন কিছু করার প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান অবকাঠামো ও লোকবল দিয়েই তা ভালোভাবে কার্যকর করা সম্ভব। এর জন্য শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের সত্ ইচ্ছা ও আগ্রহই যথেষ্ট। গাঠনিক মূল্যায়নই পারে শ্রেণিকক্ষ নামের কালো বক্সের ভেতরে কার্যকর শিক্ষা পরিবেশ প্রবর্তন করতে এবং শিক্ষাকে কার্যকর করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়