মুজিবনগর দিবসে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেয়ার শপথ

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৪২
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা ও মুজিবনগর দিবসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকারি ছুটি ঘোষণার জোর দাবির মধ্য দিয়ে গতকাল বুধবার রাজধানীসহ সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে পালিত হয়েছে ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। দেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠের ৪২ বছর পূর্তির এ দিনটি স্মরণে রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি স্মৃতিবিজড়িত মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননেও জাতীয়ভাবে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে পালিত হয়েছে। দিবসটিতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের জনতার ঢল নামে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, প্রতিমন্ত্রীগণ এবং দলীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসাবে দলের পক্ষে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, সাহারা খাতুন, সতীশ চন্দ্র রায়, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, উপ-দপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে ভোর ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন এবং দেশের সব জেলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে মুজিবনগর দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বঙ্গবন্ধুভবন ত্যাগ করার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতা-কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ সারিবদ্ধভাবে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা আওয়ামী লীগ, ওলামা লীগ, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, মত্স্যজীবী লীগ, যুব শ্রমিক লীগ, হকার্স লীগ, তাঁতী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা জনতা লীগ, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, মোটর চালক লীগ, জাতীয় বিদ্যুত্ শ্রমিক লীগ, বাস্তুহারা লীগ, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা ঐক্যজোট, রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগ, নির্মাণ শ্রমিক লীগসহ অসংখ্য দল ও সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষ বঙ্গবন্ধুর প্রতৃিকতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে। সকাল থেকেই আওয়ামী লীগ এবং এর সকল সহযোগী সংগঠন ছাড়াও অসংখ্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী এবং সর্বস্তরের মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রাঙ্গণ। সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়ক ও এর আশপাশের এলাকা। এ সময় বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে উপস্থিত হাজার হাজার নারী-পুরুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হতে থাকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘জামায়াত শিবির রাজাকার এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’, ‘মুজিবের বাংলায় খুনিদের ঠাঁই নাই’, সকাল সাড়ে ৭টায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বনানী কবরস্থানে শহীদ জাতীয় তিন নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ ও ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। এ সময় সেখানে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রাজশাহীতে আরেক শহীদ জাতীয় নেতা এএইচএম কামরুজ্জামানের মাজারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননেও জাতীয়ভাবে কর্মসূচি পালিত হয়। সেখানে ভোর ৬টায় জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ১১টায় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ১১টা ১৫ মিনিটে গার্ড অব আনার প্রদান এবং সাড়ে ১১ টায় মুজিবনগর দিবসের তাত্পর্য ব্যাখ্যা করে শেখ হাসিনামঞ্চে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও মুজিবনগর দিবস উদযাপন কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাসিম। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে জেপি’র পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ গতকাল জাতীয় পার্টির (জেপি) পক্ষ থেকে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জেপি’র কেন্দ্রীয় কৃষি বিষয়ক সম্পাদক ও মেহেরপুর জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল হালিম। তিনি কিছু সময় সেখানে অবস্থান করেন এবং শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করেন। এ সময় জেপি’র অন্য নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের জেলা শাখার সহ-সভাপতি এডভোকেট মুজাম্মেল, সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুর রাজ্জাক, সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান, সদর উপজেলা সভাপতি হাজী গোলাম রহমান, গাংনী পৌর সভাপতি হাজী মো. আজমত আলী প্রমুখ। মেহেরপুর প্রতিনিধি জানান, মুজিবনগর আম্রকাননে শেখ হাসিনা মঞ্চে এক বিশাল জনসভায় সভাপতির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও মুজিবনগর দিবস উদযাপন কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ১৯৯৬ সালে আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে সন্ত্রাস দমন করেছি। শেখ হাসিনার সরকার দেশের উন্নয়নের জন্য সব সময় কাজ করে। তিনি বলেন, পুলিশ কোন দলের নয়, পুলিশ জনগণের জানমাল রক্ষা করে। অথচ বেগম জিয়ার নির্দেশে পুলিশের উপর হামলা চালানো হচ্ছে। বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার উদ্দেশ্য তিনি বলেন, তিনি সাপের ঝাপি মাথায় নিয়ে ঘুরছেন। বিএনপি আর জামায়াত এখন এক হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, জামায়াত একটি সন্ত্রাসী ও যুদ্ধাপরাধী দল। তাদের রাজনীতি করার কোন অধিকার নেই। এই সরকারের আমলেই তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হবে। টিআইবি আগামী নির্বাচনের যে ফর্মুলা দিয়েছে তা বাস্তবায়ন হবে না। কারণ জনগণ এতো জটিল ফর্মুলা বোঝে না। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে কোন নির্বাচন হবে না। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধিনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হবে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় মেহেরপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সভাপতিত্বে এ জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন মত্স্য প্রতিমন্ত্রী আব্দুল হাই এমপি, প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন, আওয়ামী লীগের খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক এমপি, খালিদ মাহমুদ চীেধুরী এমপি প্রমুখ। জনসভার আগে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মুজিবনগর স্মৃতি সৌধে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিনটি পালনের কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর বেলা ১১টায় মোহাম্মদ নাসিম স্মৃতিসৌধে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। পুষ্পমাল্য অর্পণ শেষে শেখ হাসিনা মঞ্চের সামনে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন মোহাম্মদ নাসিম। এ সময় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। খুলনা অফিস জানান, নানা আয়োজনের মধ্যদিয়ে বুধবার খুলনায় ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস পালিত হয়েছে। দিবসটি পালন উপলক্ষে সকালে খুলনা জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন। এর আগে খুলনা সার্কিট হাউজ থেকে এক বর্ণাঢ্য র্যালি নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন বিভাগীয় কমিশনার মোঃ আব্দুল জলিল। বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন খুলনা জেলা পরিষদ প্রশাসক শেখ হারুনুর রশীদ, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মিজানুর রহমান মিজান প্রমুখ। বরিশাল অফিস জানান, ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে নগরীর সোহেল চত্বরে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সংসদ সদস্য তালুকদার মোহম্মদ ইউনুছ। বক্তৃতা করেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. আফজালুল করিম, যুব লীগের কেন্দ ীয় নেতা সেরনিয়াবাত সাদেক আব্দুল্লাহ, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সুমন সেরনিয়াবাত, আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাসউদ বাবলু। সভায় সকল নৈরাজ্য মোকাবেলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানানো হয়। রংপুর প্রতিনিধি জানান, রংপুরে দিবসটি পালন উপলক্ষে সকালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ ীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ এইচএন আশিকুর রহমান এমপি। জেলা প্রশাসক ফরিদ আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন, জেলা পরিষদের প্রশাসক এ্যাডভোকেট রেজিনা রাজ্জাক।