হেফাজতে ইসলামের উত্থাপিত ১৩ দফা বাস্তবায়ন হতে দেবে না নারী সমাজ। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সঙ্গে বৈঠকে বিভিন্ন নারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এ প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, হেফাজত নারী সমাজকে ঘরে ঢুকিয়ে বাংলাদেশকে মধ্যযুগীয় অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে চায়। কিন্তু আমরা তাদের সেই ইচ্ছা পূরণ হতে দেব না। হেফাজতের ১৩ দফার প্রতিবাদে আগামী ২৭ এপ্রিল রাজধানীতে প্রতিবাদী নারী গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য প্রবীণ রাজনীতিক আমির হোসেন আমু। বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, সাহারা খাতুন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, গণতন্ত্রী পার্টির নুরুর রহমান সেলিম, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান, জাসদের শিরিন আক্তার, ন্যাপের আমেনা আহমেদ এমপি প্রমুখ। নারী নেতৃবৃন্দের মধ্যে সাবেক এমপি তাসমিমা হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য নাসরিন আহমেদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সারা যাকের, খেলাফত আন্দোলনের নেত্রী পান্না কাওসার, ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর, নারী নেত্রী ফজিলাতুন্নেছা ইন্দিরা, আশরাফুন্নেছা মোশারফ, নাজমা আক্তার, নাজমা আক্তার এমপি, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, অধ্যাপক জাহানারা নওশিন, নাহিদ সুলতানা, রেখা সাহা, শামছুন্নাহার, মাহবুবু বেগম, মুর্শিদা আক্তার নাহার, সেলিনা আহমেদ, সাংবাদিক মুন্নি সাহা, শাহনাজ মুন্নী, মাসুদা ভাট্টি, গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠনের নেত্রী নাজমা আক্তার, হাজেরা সুলতানা প্রমুখ। বৈঠকে পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।
আমির হোসেন আমু বলেন, বিএনপি-জামায়াতের নতুন সংস্করণ হলো হেফাজত। এরা পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশকে মিশিয়ে দিতে চায়। দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া এই অপশক্তির মোকাবেলায় সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দেশের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ে জিততেই হবে।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, স্বাধীন দেশে কিভাবে হেফাজত ১৩ দফা দিতে পারে-তা ভেবে আমি হতবাক হয়েছি। দেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতেই তাই নারীদের ঘরে বন্দী রাখতে চায়। এই হেফাজতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের মধ্যে ৯টি দল রয়েছে। তারা কোনমতে ক্ষমতায় আসতে পারলে মেয়েদের ঘরে ফিরে যেতে হবে। দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে।
মোহাম্মদ নাসিম বলেন, নারীর অধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে শেখ হাসিনা কোন আপোষ করবেন না। নারী ক্ষমতায়নে বঙ্গবন্ধু কন্যা কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করায় দেশের নারী সমাজ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল যদি আগামীতে ক্ষমতায় না আসতে পারে তাহলে নারীদের ঘরে বন্দী থাকতে হবে।
মতিয়া চৌধুরী হেফাজতের ১৩ দফার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, যে দাবি নারীদের পঙ্গু করে দেয় তার বিরুদ্ধে নারী সমাজকে লড়াই চালিয়ে জিততেই হবে।
রাশেদ খান মেনন বলেন, ইসলাম নারীকে যে সম্মান দিয়েছে হেফাজত নারীদের সেই সম্মানটুকুও দিচ্ছে না। হেফাজতের হুমকির পাল্টা জবাবে তিনি বলেন, নারীদের দাবি বাস্তবায়ন না হলে সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে না, ক্ষমতায় আসতেও পারবে না।
সাবেক সংসদ সদস্য তাসমিমা হোসেন বলেন, দেশের ৫০ ভাগ মানুষ নারী। সেই নারীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। হেফাজত এই নারী সমাজকে মধ্যযুগীয় জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ধর্মকে ব্যবহার করে তারা নারী সমাজকে ধ্বংস করে দিতে চায়। তাই নারীদের সামনে বড় যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতেই হবে। এক্ষেত্রে একাত্তরের মতো ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর বলেন, কারো বৈধ কাজে বাধা দেয়া আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। তাদেরকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ইসলামে নারীর মর্যাদার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইসলামের প্রথম মুসলমান একজন নারী। এ বিবি খাদিজাই তার সমস্ত সম্পদ ইসলামের জন্য দান করেছেন।
নারী নেত্রী সেলিমা আহমেদ বলেন, দেশের ৮ কোটি নারী যখন হেফাজতের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামবে তখন তারা পালাতে বাধ্য হবে। ধর্ম আমার, আমার ধর্ম পালন করবো। এখানে কোনো ব্যক্তি বাধ্য করতে পারে না। গার্হস্থ্য নারী শ্রমিক ইউনিয়নের মুর্শিদা আক্তার নাহার বলেন, আমাদের যারা বর্বরতার যুগে ঠেলে দিতে চায় তাদের রুখে দেব।
নারী নেতৃবৃন্দ বলেন, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবির প্রতিবাদে ২৭ এপ্রিল বিকাল ৩টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের কদম ফোয়ারায় গণসমাবেশের মূল মঞ্চ স্থাপিত হবে। নারীদের এ সমাবেশে কেন্দ্রীয় ১৪ দল সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। একই দিন মতিঝিলে গার্মেন্টস শ্রমিকরাও হেফাজতের দাবির প্রতিবাদে সমাবেশ করবে। নারী নেত্রীরা ২৭ এপ্রিলের সমাবেশের জন্য সহযোগিতা চান ১৪ দলের কাছে। তার জবাবে ১৪ দল সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে বলে তাদের আশ্বস্ত করেন।
অধ্যাপক নাসরিন আহমেদ প্রতিটি এলাকায় গিয়ে নারীদের সচেতন করে তোলার জন্য নারী সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টি বলেন, হেফাজতের দাবি শুধু নারীর বিরুদ্ধে নয়। এ দাবি মানবতার বিরুদ্ধে। এদের রুখে দেয়া সবার নৈতিক দায়িত্ব।
