বরিশালে হেফাজতের মহাসমাবেশে বক্তারা

ঢাকা অবরোধের মধ্য দিয়ে দাবি আদায় করা হবে

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৩৫
১৩ দফা দাবি আদায় ও আগামী ৫ মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে গতকাল নগরীর ফজলুল হক এভিনিউতে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশে বক্তারা বলেন, দিন বদলের ইশতেহার দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া সরকার এখন ঈমান বদলের সরকারে রূপ নিয়েছে। হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে বলা হয়, আগামী নির্বাচন হবে ১৩ দফার নির্বাচন। যারা দাবি মানবে তারা ক্ষমতায় যাবে, যারা মানবে না তারা ক্ষমতায় যেতে পারবে না। আগামী ৫ মে ঢাকা অবরোধের মধ্য দিয়ে ১৩ দফা দাবি আদায় করে নেয়া হবে। বক্তারা বলেন, যারা বলে বেড়াচ্ছেন হেফাজতে ইসলাম লেজ গুটিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পালিয়েছে তাদের সাথে ৫ মে ঢাকার রাজপথে দেখা হবে। বরিশালে হেফাজতে ইসলামের আমীরসহ নেতাকর্মীদের উপর হামলা-মামলা ও নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়, যারা উপরের চাপের অজুহাতে হেফাজত নেতাদের গ্রেফতার করেছেন তাদের মনে রাখতে হবে এবার নিচ থেকে চাপ প্রয়োগ করা হবে। তাহলেই আপনাদের উপরের চাপ বন্ধ হয়ে যাবে। বক্তারা বলেন, কাউকে ক্ষমতায় বসানো বা ক্ষমতা থেকে উত্খাতের জন্য আমরা আন্দোলন করছি না। এ আন্দোলন ইসলাম রক্ষার আন্দোলন, ঈমান রক্ষার আন্দোলন। সমাবেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, আন্দোলনরত আলেম-ওলামার বুকে আর যদি একটি গুলিও চলে তাহলে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাটুরিয়া আগুন জ্বলবে। সে আগুন নেভানোর ক্ষমতা বর্তমান সরকারের নেই। সমাবেশ থেকে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মুক্তি ও সকল সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধের দাবি জানিয়ে বলা হয় যেসব গণমাধ্যম ইসলাম বিরোধী অবস্থান নিয়েছে তা বন্ধ করতে হবে। নগরীর ফজলুল হক এভিনিউতে আয়োজিত মহাসমাবেশে নগরী ও পার্শ্ববর্তী জেলা-উপজেলার মাদ্রাসা থেকে দুপুরের পরই হাজার হাজার মুসল্লি শ্লোগান দিয়ে যোগদান করেন। বেলা ৩টায় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ মঞ্চে ওঠার আগেই সদর রোড, চকবাজার, লঞ্চঘাট এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। এ সময় তারা মুরতাদ, ব্লগার ও শাহবাগীদের উদ্দেশ্য করে শাস্তির দাবিতে শ্লোগান দিতে থাকেন। বিকেল সোয়া ৫টা পর্যন্ত চলে সমাবেশের কার্যক্রম। সোয়া দু ঘন্টার এ সমাবেশে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ছাড়াও আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা বক্তৃতা করেন। বিভাগীয় শানে রেসালাত মহাসম্মেলন নামে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন হেফাজত ইসলামের মহানগর শাখা আমির মাওলানা ওবায়দুর রহমান মাহবুব। প্রধান অতিথি ছিলেন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক ও ঢাকা বিভাগের আহবায়ক মাওলানা নূর হুসাইন কাসেমী, ঢাকা মহানগর যুগ্ম আহবায়ক অধ্যক্ষ মাওঃ ইসাহাক, যুগ্ম আহবায়ক আশ্রাফ আলী নিজামপুরী, মাওঃ জুনায়েদ আল হাবীব, মাওঃ মুজিবুর রহমান পেশোয়ারী, মাওঃ আবুল হাসানাত আমিনী, মাওঃ আঃ লতিফ নিজামী, মাওঃ আঃ রব ইউসুফী, মাওঃ জাফরুল্লাহ খান, মাওঃ হাবিবুর রহমান চাটগামী, মাওঃ খলিলর রহমান নেছারাবাদী, মাওঃ নূরুর রহমান বেগ, মুফতি শাব্বির আহমেদ, বরগুনার হেফাজত নেতা মাওঃ হারুনর রশিদ, ভোলার মাওঃ শহিদ উদ্দিন, মাওঃ আঃ হক কাওসারী, মাওঃ আবু সাঈদ, মাওঃ আঃ গাফফার, মাওঃ আবুল কাশেম শাহজাহান, মাওঃ সুলতান মাহমুদ, আতাউল্লাহ মাহমুদী, মাওঃ আঃ হালিম। প্রধান অতিথির বক্তৃতায় হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক ও ঢাকা বিভাগের আহবায়ক মাওলানা নূর হুসাইন কাসেমী বলেন, ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব। এ সমাবেশ কোনো রাজনৈতিক দল বা মন্ত্রীর নয়। আমরা কেউ রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হতে চাই না। যারা এসব পদে বহাল রয়েছেন তাদেরকে এ দাবি মেনে নিয়ে ক্ষমতায় থাকতে হবে। তৌহিদী জনতার দাবি না মানলে ক্ষমতায় থাকতে দেয়া হবে না। বর্তমান সরকারকে ইসলাম বিরোধী চক্রান্তকারী জালেম সরকার আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, শাহাবাগী মুরতাদ ব্লগাররা এদেশের ইসলাম প্রিয় মানুষের বুকে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সে আগুন না নিভিয়ে উল্টো পরিস্থিতি কিভাবে সামাল দিতে হয় তার হুঙ্কার দিয়ে তৌহিদী জনতাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী জানেন না তৌহিদী জনতা আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুল ছাড়া কাউকে ভয় করে না। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেন, দেশে শান্তি-শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে চাইলে অবিলম্বে ১৩ দফা মেনে নিন। এদেশে ইসলাম আছে- থাকবে। নাস্তিক, মুরতাদদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশকে নাস্তিকদের রাষ্ট্র বানানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। ১৩ দফা বাস্তবায়ন করা না হলে ধরে নেয়া হবে এ সরকার নাস্তিক, মুরতাদ, ব্লগারদের সরকার। আর নাস্তিকদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের লড়াই করে যাওয়াই হচ্ছে ঈমানী দায়িত্ব। হেফাজতে ইসলামের উপদেষ্টা মাওঃ আঃ হামিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী মদীনা সনদের নামে মানুষের সাথে মিথ্যাচার করছে। তিনি শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, বাংলাদেশে থাকতে চাইলে হাটহাজারী শাহ আহমদ শফী’র কাছে গিয়ে তওবা করে আসুন। ঢাকা মহানগর যুগ্ম আহবায়ক আব্দুল্লাহ আবু সুফী বলেন, সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা না রেখে মা দুর্গার উপর আস্থা রাখতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন আমাদের ১৩ দফা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। আমরা শুধু কোরআন শরীফ পড়ি, সংবিধান পড়ি না তা যদি কেউ মনে করেন ভুল করছেন। সংবিধানের নাম দিয়ে এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সাথে প্রতারণা করতে দেয়া হবে না। কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব মাওঃ মঈনুদ্দিন রুহ বলেন, হেফাজতের আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য গার্মেন্টস মালিকদের চাপ প্রয়োগ করে নারী শ্রমিকদের নিয়ে সমাবেশের পাঁয়তারা চালানো হচ্ছে। অবরোধ কর্মসূচিতে যেখানে বাধা আসবে সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার গণজাগরণ মঞ্চকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। হেফাজতে ইসলামের ঢাকা মহানগর যুগ্ম আহবায়ক আবুল হাসানাত আমিনী বলেন, সরকারের কাছে যত গুলি আছে তার চেয়ে হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মী অনেক বেশি। কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব মাওঃ জাফর উল্লাহ খান বলেন, হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ মানেই ঈমান রক্ষার সমাবেশ। তিনি হেফাজতে ইসলামের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাধা প্রদানকারীদের হুঁশিয়ারি করে দিয়ে বলেন, ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে বাধা দিলে তার নামাজে জানাজা পড়া হবে না। ঢাকা মহানগর উপদেষ্টা এডভোকেট আঃ রকিব বলেন, সরকার নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে না নিয়ে সারাদেশে অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। তারা সারা জীবন জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চায়। তিনি বলেন, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফাই স্বাধীনতার রক্ষা কবচ। এ দাবি পূরণ না করে সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। খাবার সরবরাহ করেছে বিএনপি মহাসম্মেলনে দূর দূরান্ত থেকে আসা হেফাজত ইসলামের নেতা-কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে খাবার পানি, কেক, বিস্কুট, আইসক্রিম, শশাসহ নানা প্রকার খাবার বিতরণ করছে বরিশাল জেলা ও মহানগর বিএনপি। বিএনপি’র পক্ষ থেকে অস্থায়ী প্যান্ডেল তৈরি করে সমাবেশে আগতদের খাবার সরবরাহ করা হয়। ফজলুল হক এভিনিউ, সিটি কর্পোরেশনের সামনে ও লঞ্চঘাট এলাকায় অস্থায়ী প্যান্ডেলে বিএনপি নেতা-কর্মীরা উপস্থিত হয়ে এ খাবার সরবরাহ করেন। বিএনপি সমর্থিত চিকিত্সক সংগঠন ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) ফজলুল হক এভিনিউতে চিকিত্সা সেবা দিতে অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে।