‘তোমার দানের মাটি সোনার ফসল তুলে ধরে’

আপডেট : ০৭ মে ২০১৯, ২১:৫১

আমাদের প্রাণের স্তরে স্তরে ছড়ানো রহিয়াছে পঁচিশে বৈশাখ, বাঙালির প্রাণের কবি রবীন্দ্রনাথের জন্মজয়ন্তী। আকাশের রবির মতোই আমাদের জগতের সবচাইতে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক তিনি। রবি তথা সূর্য যেমন সকলের, রবীন্দ্রনাথও কোনো দেশ-কালের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নহেন। তিনি সার্বভৌম মানবতাবাদী কবি। ধ্রুবতারার মতোই এখনো তিনি পথ দেখান আমাদের অন্তরের দিশেহারা মুহূর্তে। আমাদের যে কোনো শোক বা শক্তি, আনন্দ বা অশ্রুর স্বরলিপি রবীন্দ্রনাথের কোনো না কোনো কবিতা বা গানের ভিতরে খুঁজিয়া পাই।

তাঁহার সৃষ্টির বিশাল ব্যাপ্তিকে উপলব্ধি ও আবিষ্কার করিবার ভিতরে পাঠকের যে আনন্দ, তাহা অতুল্য। তাঁহাকে অসংখ্যবার পড়িয়াও যেন শেষ করা যায় না। অসীম মহাসাগরের মতো তাঁহার সৃষ্টিকর্ম। রবীন্দ্রনাথের কাব্যসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হইল—ভাবগভীরতা, গীতিধর্মিতা চিত্ররূপময়তা, অধ্যাত্মচেতনা, ঐতিহ্যপ্রীতি, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, রোমান্টিক সৌন্দর্যচেতনা, ভাব, ভাষা, ছন্দ ও আঙ্গিকের বৈচিত্র্য, বাস্তবচেতনা ও প্রগতিচেতনা। তাঁহার গদ্যভাষার মধ্যেও রহিয়াছে অপূর্ব কাব্যময়তা। এই বাংলার পটভূমিতেই তাঁহার অসংখ্য ছোটগল্প গড়িয়া উঠিয়াছে। এইখানেই তিনি জীবনের বহুবিচিত্র দিক প্রতিফলিত করিয়াছেন, সৃষ্টি করিয়াছেন বাংলা ছোটগল্পের নবধারা। ছোটগল্প ছাড়াও তাঁহার হাত দিয়া ছিন্নপত্র বা কবিতায় যেইভাবে এই বাংলাদেশ ফুটিয়া উঠিয়াছে, যেই প্রকৃতি মায়ের শ্যামল পরশ তাহার সৃষ্টিতে সমাচ্ছন্ন, তাহার পঠনে আবেগ-উচ্ছ্বাসের ঢেউ ওঠে আমাদের হূদয়ে—তাহা এমন করিয়া আর কোথায় পাইব আমরা?

আমাদের চিরগৌরবের মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মনন-চেতনার সঙ্গী, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রেরণার উত্স। আশ্চর্যের কথা হইল—বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশই নিজ-নিজ জাতীয় সংগীত খুঁজিয়া লইয়াছে রবীন্দ্ররচনার অমৃত-ভাণ্ডার হইতেই। এমনকী শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতেও রহিয়াছে রবীন্দ্রপ্রভাব! ভারতীয় উপমহাদেশের ধ্রুপদী ও লৌকিক সংস্কৃতি এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞানচেতনা ও শিল্পদর্শন তাহার রচনার ভিতর দিয়া অপূর্ব ফল্গুধারায় মূর্ত হইয়া উঠিয়াছে। কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে গভীর সব মতামত প্রকাশ করিয়াছেন। আর তাঁহার গানের ভান্ডার আমাদের জন্য এক বিস্ময়কর সম্পদ। আজিকার এই রকেটগতির যুগেও রবীন্দ্রসংগীতের আবেদন আরো বেশি মাত্রায় প্রস্ফুটিত হইয়া উঠিতেছে।

জীবদ্দশায় তাঁহার শেষ ‘পঁচিশে বৈশাখ’-এ তিনি ডাক দিয়াছিলেন ‘চিরনূতনেরে’। এই চিরনূতনেরাই এখন রাষ্ট্র হইতেছে দিকে দিকে। তিনি তাই, এই সময়ের জীবনাচরণে, আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হইয়া উঠিতেছেন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য যেমনটি বলিয়াছেন তাঁহার সম্পর্কে—‘এখনো প্রাণের স্তরে স্তরে, / তোমার দানের মাটি সোনার ফসল তুলে ধরে।’ এখনো বিশ্বব্যাপী দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও বৈষম্যের বিলোপ সাধন এবং ধর্ম-বর্ণ-ভাষায় বৈচিত্র্য সমুন্নত রাখিতে রবীন্দ্রনাথের জীবন ও দর্শন উজ্জ্বল এক আলোকবর্তিকা।