উত্পাদন খরচ সবমিলিয়ে ৯০ টাকা। অথচ বিক্রির দর ৫০ টাকা। প্রতি কেজি চিনিতে লোকসান ৪০ টাকা। তারপরও বিক্রি হচ্ছে না সরকারের চিনি। হাজার হাজার টন চিনি অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে সরকারি গুদামে। কারণ একটাই, বাজারে বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর চিনি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪২ থেকে ৪৩ টাকায়। অর্থাত্ সরকারের চিনির চেয়ে তা ৭ থেকে ৮ টাকা কম। তারপরও টনক নড়ছে না খাদ্য ও চিনি শিল্প কর্পোরেশনের।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আখ থেকে চিনি রিকভারির হার কম হওয়ায় উত্পাদন খরচ বেশি পড়ছে। সেইসাথে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চিনি কলগুলোর লোকসানের অন্যতম কারণ। এছাড়া মিলগুলোর চাহিদামতো আখের যোগান না পাওয়া, চাষীদের দাম কম দেয়ার পাশাপাশি সময়মতো পাওনা পরিশোধ না করাসহ আরো কারণ রয়েছে লোকসানের পেছনে।
বিপুল লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে রীতিমতো ডুবতে বসেছে দেশের কৃষিভিত্তিক বৃহত্ এই শিল্প। ধার-দেনায় জর্জরিত রাষ্ট্রায়ত্ত ১৫টি চিনিকলের এখন বড়ই বেহাল দশা। অথচ এসব চিনিকলে সরাসরি কর্মসংস্থান রয়েছে কয়েক হাজার মানুষের। এছাড়া পরোক্ষভাবে লাখ লাখ আখচাষির জীবন-জীবিকার বিষয়টিও এসব মিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর ক্রমাগত লোকসানের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। সমপ্রতি প্রাক বাজেট আলোচনায় তিনি বলেন, চিনি কলগুলো বন্ধ করে দিলে প্রতি বছর দেশের মানুষের অন্তত ৪শ’ কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। তবে ওই বৈঠক থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো দিক-নির্দেশনা দেননি তিনি।
চিনি তৈরি: জার্মানি টু সেতাবগঞ্জ :অনুসন্ধানে যতদূর জানা যায়, ইউরোপে শিল্প বিপ্লব শুরু হলে প্রথম জার্মানি ও ফ্রান্স সুগার বিট থেকে বৃহত্ কলে চিনি উত্পাদন শুরু করে। তবে এর যাত্রা খ্রিষ্টপূর্ব ১ হাজার ৪শ’ বছর আগে। তখন ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের মানুষ কাঁশ বাগানের মত এক ধরনের গাছ চিবিয়ে মিষ্টতা পায়। পরে ওই গাছের রস জ্বাল দিয়ে তারা গুড় তৈরি করত। নানা বিবর্তনের পর বর্তমানে আখ থেকে আধুনিক কারখানায় চিনি উত্পাদন হচ্ছে। তত্কালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গে ১৯৩৩ সালে আখ থেকে চিনি তৈরির প্রথম মিল স্থাপন হয় রাজশাহী জেলার গোপালপুরে ও দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জে। এরপর দেশবন্ধু চিনিকল স্থাপিত হয় ১৯৩৪ সালে। কুষ্টিয়ার দর্শনাতে ১৯৩৮ সালে স্থপিত হয় কেরু এন্ড কোম্পানি। পাকিস্তান আমলে তত্কালীন ইপিআইডিসি পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, শ্যামপুর, রংপুর, জয়পুরহাট, রাজশাহী, কুষ্টিয়া ও মোবারকগঞ্জ চিনিকল নির্মাণ করে। স্বাধীনতার পর ফরিদপুর, নাটোর ও পাবনা চিনিকল স্থাপন করে চিনি শিল্প করপোরেশন। মোট ১৭টি চিনিকলের মধ্যে দেশবন্ধু ও কালিয়াচাপড়া চিনিকল বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়।
চাহিদার তুলনায় বাড়েনি উত্পাদন :জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে চিনির চাহিদা। কিন্তু বাড়েনি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর উত্পাদন। বর্তমানে দেশে চিনি ও গুড়ের চাহিদা প্রায় ১৭ লাখ টন। এরমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলে উত্পাদন হয় এক লাখ টনের মত, আখের গুড় উত্পাদন হয় ৬ লাখ টন এবং খেজুর ও তাল গুড় হয় সোয়া লাখ টন। বাকি চাহিদা মিটানো হয় আমদানিকৃত ‘র’ সুগার থেকে দেশে স্থাপিত রিফাইনারিগুলোর উত্পাদিত ও বিদেশ থেকে আমদানিকৃত চিনির মাধ্যমে। অথচ চাহিদামতো চিনি উত্পাদন করতে পারলে দেশেই ছিল চিনির বড় বাজার।
আখের অভাবে বছরের নয় মাসই বন্ধ থাকে মিলগুলো : এই শিল্পের প্রধান কাঁচামাল আখ। মিলগুলোর নিজস্ব খামার ও চাষিদের ক্ষেতের আখ থেকেই এই যোগান আসে। তবে চাহিদার তুলনায় এই যোগান এতই কম যে, কোন মৌসুমের ৩-৪ মাস ছাড়া বছরের বাকি সময় মিলগুলোকে বসে থাকতে হয়।
তবে মিলগুলোর চাহিদামতো আখের যোগান না পাওয়ার পেছনে রয়েছে চাষিদের আখের দাম কম দেয়া, সময়মতো দাম পরিশোধ না করাসহ চাষিদের নানা ভোগান্তি। অভিযোগ রয়েছে, মিলগুলোর ক্রয় কেন্দ্রগুলোর এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। প্রুজি (আখ বিক্রির অনুমতিপত্র) পেতে চাষিদের দিনের পর দিন ক্রয় কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের পিছু পিছু ঘুরতে হয়। ওজনে ঠকানোরও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া চাষীদের বিক্রিত আখের টাকা পেতে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। ফলে মিলগুলোতে আখ বিক্রিতে অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন চাষীরা। কমিয়ে দিয়েছেন আখ চাষও। ঝুঁকে পড়েছেন অন্য ফসল চাষে।
খাদ্য ও চিনি শিল্প কর্পোরেশন সূত্র জানিয়েছে, চিনিকলগুলোর নিজস্ব খামার গুলোতে ১৩ হাজার হেক্টর জমি আছে। এর অধিকাংশ জমি লিজ দিয়ে আখ চাষ করানো হয়। প্রতি একরে গড়ে ২০- ২১ মণ আখ উত্পাদন হয়। আখ সারা বছরের ফসল হলেও চাষে সব ধরনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চাষীদের পোষাচ্ছে না।
অথচ এই শিল্পের কোন কিছুই ফেলনা নয়। ক্ষেত থেকে আখ কাটার পর শুকনো পাতা জ্বালানি ও কাঁচা পাতা গো খাদ্য হিসাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। এছাড়া চিনি উত্পাদনের পর উপজাত হিসাবে পাওয়া চিটা গুড়ের ও দাম যথেষ্ট। চিটা গুড় দিয়ে ডিস্টিলারিতে এ্যালকোহল ও বিভিন্ন প্রকার স্পিরিট তৈরি হয়। দেশে একমাত্র কেরু এন্ড কোম্পানিতে চিনি কলের ডিস্টিলারিতে চিটাগুড় দিয়ে অ্যাকোহল ও স্পিরিট তৈরি হয়। এছাড়া ছোবড়া দিয়ে কাগজ তৈরির মন্ড তৈরি হয়ে থাকে। প্রেসমাড বা গাদ দিয়ে জৈব সার তৈরি করা যায়। দর্শনাতে একটি জৈর সার তৈরির কারখানা নির্মাণ করা হয়েছে। উত্পাদন এখনও শুরু হয়নি। এছাড়া গাদ দিয়ে স্থানীয় ভাবে রান্নার জ্বালানি তৈরি করা হয়।
জোড়াতালি দিয়ে চলছে মিলগুলো :একদিকে দেশে উত্পাদিত আখের মান উন্নত না হওয়া অন্যদিকে চিনিকলগুলোর যন্ত্রপাতি বহু পুরনো হওয়ায় আখ থেকে চিনি রিকভারির পরিমাণ কম। ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ১২টি ৪০ থেকে ৮৩ বছরের পুরানো। মেরামত করে জোড়াতালি দিয়ে কোনরকমে চালানো হচ্ছে। আর প্রতি বছর মেরামত কাজে ব্যয় করা হচ্ছে মোটা অংকের অর্থ। এছাড়া মিলগুলোতে শতকরা আড়াই-তিন ভাগ ‘প্রসেস লস’ বলে চালানো হয়ে থাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চিনি শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে অধিক ফলন ও চিনিযুক্ত আখ উদ্ভাবন করতে হবে। কম জমিতে বেশি আখ উত্পাদন হলে চাষি আখ চাষে ফের আগ্রহী হবে। এছাড়া নতুন যন্ত্রপাতি বসিয়ে মিলগুলোরও চিনি রিকভারির পরিমাণ বাড়াতে হবে।
এ প্রসঙ্গে ঈশ্বরদী ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটের কৃষি বিজ্ঞানী ড. খলিলুর রহমান বলেন, ঈশ্বরদী ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত আখের ৪১টি জাত অবমুক্ত করেছে। প্রতিটি জাতে চিনির পরিমাণ শতকরা ১২ থেকে ১৩ ভাগ। কিন্তু মিলগুলোর চিনি রিকভারির হার কোন মিলে ৬ ভাগ, আবার কোন মিলে ৮ ভাগ। অথচ একই আখ মাড়াই করে ১০ থেকে ১১ ভাগ গুড় উত্পাদন করেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া ভারতের চিনিকলগুলোর চিনি রিকভারির হার শতকরা ১১ ভাগ ও পাকিস্তানেও ১০ ভাগের কাছাকাছি বলে তিনি জানান।
বাড়ছে লোকসান :আখের অভাবে ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ১৪টি চিনিকল। একমাত্র নর্থ বেঙ্গল চিনি কল চালু আছে। এদিকে মিলগুলো বছরের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকায় উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন নিয়ে রয়েছে সংশয়।
খাদ্য ও চিনি শিল্প করপোরেশন সূত্র জানায়, ২০১১ - ২০১২ মাড়াই মৌসুমে ১৭ লাখ ৯৫ হাজার টন আখ মাড়াই করে এক লাখ ৩৫ হাজার ৩শ’ ৭০ টন চিনি উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ১০ লাখ ৪৭ হাজার ৫শ’ ৫৯ টন আখ মাড়াই করে ৬৯ হাজার ৩শ’ ৪৬ টন চিনি উত্পাদন হয়। লক্ষ্যমাত্রার শতকরা ৫১ ভাগ অর্জিত হয়েছিল। চলতি মাড়াই মৌসুমে ( ২০১২ - ২০১৩ ) ১৫টি চিনি কলে ১৭ লাখ ৪৫ হাজার টন আখ মাড়াই করে এক লাখ ২৯ হাজার ৭৫ টন চিনি উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। ১ এপ্রিল পর্যন্ত এক লাখ ৫ হাজার ৮৬ টন চিনি উপাদিত হয়েছে। চিনি রিকভারির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৪ ভাগ। কিন্তু রিকভারি হয়েছে ৬ দশমিক ৮৬ ভাগ।
এদিকে উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় লোকসানের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। ২০১০ - ২০১১ অর্থ বছর পর্যন্ত কর্পোরেশনের লোকসানের পরিমাণ ছিল ১৬শ ৪৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। তার সাথে যোগ হয়েছে গত অর্থ বছরের (২০১১ -২০১২ ) লোকসান। গত অর্থ বছরে লোকসান হয় ২শ’ ৮০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে বিভিন্ন চিনিকলের মধ্যে পঞ্চগড় চিনি কলের ১৯ কোটি, ঠাকুরগাঁও চিনি কলের ২৭ কোটি, সেতাবগঞ্জ চিনিকলের ২২ কোটি ৯৪ লাখ, শ্যামপুর চিনিকলের ১৮ কোটি ৭১ লাখ, রংপুর চিনি কলের ১৮ কোটি ৭ লাখ, জয়পুরহাট চিনিকলের ২৬ কোটি, রাজশাহী চিনিকলের ২৬ কোটি ২৬ লাখ, নাটোর চিনিকলের ২২ কোটি ৬৪ লাখ, নর্থবেঙ্গল চিনিকলের ২০ কোটি ৯৭ লাখ, পাবনা চিনিকলের ২২ কোটি ২ লাখ, কুষ্টিয়া চিনিকলের ২৬ কোটি ১ লাখ, কেরু অ্যান্ড কোং (বাংলাদেশ) লিমিটেড ২৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা, ফরিদপুর চিনিকলের ১৯ কোটি ১০ লাখ, ঝিনাইদহের মোবারকগঞ্জ চিনিকল ১৯ কোটি ৩৪ লাখ ও জামালপুরের ঝিল বাংলা ১৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লোকসানের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চিনিকলগুলোর দেনার পরিমাণ। চিনিকলগুলোর কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। আর এই দেনার পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।
চিনিকলগুলোর লোকসান সম্পর্কে মোবারকগঞ্জ চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ দেলওয়ার হোসেন বলেন, মিলগুলো অনেক পুরনো হয়ে গেছে। তিনি তার চিনিকলের উদাহরণ দিয়ে বলেন, প্রতি বছর মেরামত করে মোবারকগঞ্জ চিনিকল চালু রাখা হয়েছে। বছরে প্রায় দু’ কোটি টাকা মেরামতবাবদ খরচ হয়ে থাকে। তিনি বলেন, গত মৌসুমের ৩ হাজার টনের সাথে এ বছরের উত্পাদিত ৯ হাজার ৪০ দশমিক ৪৩ টন চিনির পুরোটাই অবিক্রিত রয়েছে। চিনি বিক্রি না হওয়ায় মিলটি দারুণ অর্থ সংকটে পড়েছে। চাষীদের ক্রয়কৃত আখের মূল্য ৯ কোটি টাকা পরিশোধ করা যাচ্ছে না। এমনকি কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন ভাতা বকেয়া রয়েছে।
মিলের চিনি রিকভারি কম হওয়াও লোকসানের আরেকটি কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় পারছে না সরকারি চিনি কলগুলো। তারা পাইকারি ৪২ - ৪৩ টাকা কেজি দরে চিনি বিক্রি করছে। মিলের চিনির দাম কমিয়ে প্রতি কেজি ৫০ টাকা করা হয়েছে। তাও বিক্রি হচ্ছে না। অথচ মিলের প্রতি কেজি চিনি উত্পাদনে খরচ হচ্ছে ৯০ টাকা। তবে অধিক ফলন ও চিনিযুক্ত আখ উদ্ভাবনের পাশাপাশি নতুন যন্ত্রপাতি বসিয়ে মিলগুলোরও চিনি রিকভারির পরিমাণ বাড়াতে পারলে লাভজনক করা সম্ভব।
