আজকাল রাস্তায় বা পাবলিক পে¬্লসে কেহ বিপদে পড়িলে তাহাকে সাহায্য করিতে কেহ আগাইয়া আসেন না। পথিপার্শ্বে অসুস্থ বা আহত মানুষকে পড়িয়া থাকিতে দেখিলেও নির্বিকার ও ব্যস্ত মানুষগুলি নিজ নিজ কাজেই ছুটিতে থাকেন, মানবিক বিপর্যয় কাহারও দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারে না। এই বিচ্ছিন্নতার পেছনে স্বার্থপরতা যেমন একটি কারণ, তেমনি কাহাকেও সাহায্য করিতে গেলে আইনী বা পুলিশি ফ্যাসাদে জড়াইয়া পড়িবার ঝুঁকি আরেকটি কারণ। কিন্তু ঝরনা বেগমের কাছে বড় বিবেচনা ছিল মানবতা।
বিগত পহেলা এপ্রিল রাজশাহীর শালবাগানে সরকারবিরোধী আন্দোলনের কর্মীরা হেলমেট ও ইট দিয়া মাথা থেঁতলাইয়া দিবার পর রাস্তায় পড়িয়া থাকা উপপরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর আলমকে উদ্ধার করিতে কেহ যাইতেছিল না। সংঘাত ও তাহার বীভত্সতায় আশপাশের মানুষ ভীত হইয়া পড়িয়াছিল। কর্তব্যরত এসআইকে সাহায্য করিতে কেহ আসে নাই। কিন্তু ২৮ বছর বয়েসী ঝরনা বেগমের কাছে সব ভয়-দ্বিধা ছাড়াইয়া আক্রান্ত মৃতপ্রায় মানুষটিকে বাঁচানোই প্রধান বিবেচনা ছিল। তিনি জাহাঙ্গীর আলমকে কর্তব্যরত কয়েকজন সাংবাদিকের সহায়তায় হাসাপাতালে নিয়া যান। জাহাঙ্গীর আলম বাঁচিয়া উঠেন।
পুলিশ সদর দপ্তরে বুধবার এই অসমসাহসী এবং মানবতাবাদী কৃতকর্মের জন্য ঝরনা বেগমকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলিয়াছেন, সংবর্ধনা বা পুরস্কারের আশায় তিনি ইহা করেন নাই, মানবতার খাতিরে বা বিবেকের তাড়নায় সবারই ইহা করা উচিত। যাহা হউক, কয়েকটি কারণে ঝরনা বেগমের ঘটনাটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছে। দেশে চলমান সংঘাতে ও সংঘর্ষে পুলিশের নির্মমভাবে আক্রান্ত হইবার ঘটনা প্রায় অভিনব। সেই আক্রান্ত পুলিশকে সাহায্য করিতে আসিয়াছে তাহার সহকর্মী নয়, নয় পুরুষকূল, এক সাধারণ নারী। মমতা দিয়া তিনি মানবতাবোধ ও সাহসিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন। এই দৃষ্টান্ত নিশ্চয়ই অনুসরণীয় হইয়া থাকিবে দেশবাসীর কাছে।
পাশাপাশি আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করিতে হইবে যে, বাংলাদেশে মানবিক বিপর্যয় বা দুর্ঘটনার প্রতি দ্রুত সাড়া দিবার জন্য জনসেবক কোনো বাহিনী গড়িয়া উঠে নাই। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগ প্রথম কাজটিতে যতটা তত্পর দ্বিতীয় কাজটিতে ততটা নয়। পুলিশেরও প্রশিক্ষিত আধুনিক কোনো বাহিনী নাই, যাহারা আক্রান্তকে সাহায্য করিতে আগাইয়া আসিবে ত্বরিত গতিতে। কেহ বিপদে পড়িলে এখনও সাধারণ মানুষই ভরসা। অথচ বহির্বিশ্বের অনেক দেশেই দুর্ঘটনা-অসুস্থতা-আক্রমণে মানুষ কেবল এই সাহায্যটুকুই করে, সে একটি বিশেষ নম্বরে ডায়াল করিয়া ঘটনা ও তাহার স্থান সম্পর্কে জানাইয়া দেয়। নিমিষে পুলিশ আক্রান্তকে সাহায্য করিতে আগাইয়া আসে। আমাদেরও সময় আসিয়াছে বিশেষ ধরনের পুলিশ বাহিনী গড়িয়া তোলা কিংবা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে আধুনিকায়ন করা যাহাতে হঠাত্ আক্রান্ত মানুষকে ত্বরিত-সেবা দেওয়া সম্ভব হইয়া উঠে। ঝরনা বেগমের মতো মানুষ অবশ্যই মানবিক বিবেচনার বোধ হইতে আগাইয়া আসিবেন, কিন্তু জনসেবক বাহিনীরও এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার দৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি থাকা দরকার।
