চলনবিলে বিনা হালে রসুন চাষ ফিবছর দরপতনের ফাঁদে কৃষক

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৫২
বিনা হালে রসুন চাষ করে ফি বছর দরপতনের ফাঁদে পড়ছেন চলনবিলের কৃষক। আর দরপতনের মাশুল গুনতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন রসুন চাষিরা। বিশেষ করে বর্গা চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বেশি। ২০১০ সাল থেকে রসুনের দরপতন ঘটায় এ অবস্থা চলছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে চলনবিলে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর নরম কাদা মাটিতে বিনা হালে রসুন চাষ শুরু করেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। প্রায় এক দশক আগে গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা গ্রামে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (বিএস) মো. মোজাম্মেল হক এ পদ্ধতিতে রসুন চাষ উদ্ভাবন করেন। প্রথম দিকে রসুন আবাদ অধিক লাভজক হয়ে ওঠে। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে চলনবিলের বড়াইগ্রাম, সিংড়া, তাড়াশ ও চাটমোহর উপজেলা এলাকায়। আগে এ পদ্ধতিতে চাষ করা রসুনের উত্পাদন খরচ কম হতো। ফলে প্রথম দুই বছর রসুনের দাম ৬ হাজার টাকা থেকে ৮ হাজার টাকা মণদরে বিক্রি হয়। এতে রসুন চাষিরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে থাকেন। বদলে যায় এসব রসুন চাষির আর্থ-সামাজিক অবস্থা। কিন্তু ২০১০ সাল থেকে রসুন আবাদে খরচ বৃদ্ধি পায়। সেইসাথে শুরু হয় দরপতন। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, জেলার চলনবিলকেন্দ্রিক গুরুদাসপুরে ৬ হাজার ৭০০ হেক্টর, বড়াইগ্রামে ৫ হাজার ৩০০ হেক্টর, সিংড়ায় ৩ হাজার ২০০ হেক্টর, চাটমোহরে ১ হাজার ৪০০ হেক্টর এবং তাড়াশে ২ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমিতে বিনা চাষে রসুনের আবাদ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার কৃষি কর্মকর্তারা বলেন, রসুনের দরপতনের কারণে এ বছর গড়ে শতকরা ৩০-৩৫ ভাগ জমিতে রসুনের আবাদ কম হয়েছে। এ বছর রসুন আবাদে অত্যধিক খরচ হয়েছে। প্রতি বিঘা জমিতে বীজ বাবদ ৫ হাজার, সার-কীটনাশকে ৫ হাজার, নিড়ানিতে ৬ হাজার, সেচে ৩ হাজার এবং রসুন তুলতে শ্রমিক মজুরি বাবদ গুনতে হয়েছে ৮ হাজার টাকা। এছাড়া ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক (বর্গা) চাষিদের জমি লিজ ৬ হাজার টাকাসহ মোট খরচ হয়েছে ৩৩ হাজার টাকা। বিঘা প্রতি রসুন উত্পাদন হয়েছে গড়ে ১৮ থেকে ২০ মণ। বাজারে প্রতিমণ রসুন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। বিঘা প্রতি কৃষকের লোকসান হচ্ছে গড়ে ১৩ হাজার টাকা। রসুনের সবচেয়ে বড় মোকাম চলনবিলের চাঁচকৈড় হাটে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, আকার ও গুণগতমান ভেদে প্রতিমণ রসুন ৮৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা কৃষকরা রসুন নিয়ে বসে থাকলেও ক্রেতারা বেশি দামে কিনতে চাচ্ছেন না। কৃষক ইরি-বোরো আবাদ সচল রাখতে এবং সংসারের প্রয়োজন মেটানোসহ ঋণ পরিশোধ করতে কম দামে রসুন বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। চলনালী গ্রামের কৃষক আব্দুল জব্বার (৬০) জানালেন, তিনি দশ বিঘা জমিতে রসুন আবাদ করেছেন। এজন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ করেছিলেন। এখন রসুন বিক্রি করতে এসে তিনি দাম পাচ্ছেন না। ঋণ শোধ করবেন কিভাবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। বড়াইগ্রামের মানিকপুর গ্রামের কৃষক আজিজ মণ্ডল ও চাটমোহর উপজেলার ছাইকোলা গ্রামের কিসমত ব্যাপারী জানান, এক সময় বিনা হালে রসুন আবাদ করে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছিলেন। খড়ের ঘর থেকে টিনের ঘর দিয়েছেন। কিন্তু গেল তিন বছরে রসুন আবাদে লোকসান দিতে দিতে এখন তারা ঋণগ্রস্ত। তাদের মতই অবস্থা চলনবিলের সকল রসুন চাষির। নাটোর কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক মো. রহমতউল্লাহ সরকার বলেন, রসুন চাষের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে রসুনের জমিতে সাথী ফসল হিসেবে তরমুজ ও বাঙ্গির আবাদ করতে কৃষকদের উত্সাহিত করা হচ্ছে।