দেশের বিশিষ্ট নাগরিকগণ রাজধানীতে আয়োজিত জাতীয় সম্মেলন থেকে যুদ্ধাপরাধীদের মদদদাতা জামায়াতে ইসলাম ও হেফাজতে ইসলামকে রুখে দাঁড়ানোর ডাক দিয়েছেন। বর্তমান সরকারের মেয়াদেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও তা কার্যকর করে দেশকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের করেআনার দাবি জানান তারা। বক্তারা বলেন, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দেশকে তেরশ বছর পিছিয়ে দেবে। অথচ সরকার তাদের সঙ্গে আপসকামী আচরণ করছে। সরকারের এ আচরণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তারা বলেন, যার যার অবস্থান থেকে সাম্প্রদায়িক ও দেশজুড়ে জঙ্গি, সহিংসতা ছড়ানো এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকে রুখে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই। তারা বলেন, সময় অনেক নষ্ট হয়েছে এখন আর ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। বাংলাদেশকে তালেবানি রাষ্ট্র বানানোর যে চক্রান্ত ধর্মান্ধরা করছে সেই আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। বক্তারা বলেন, মৌলবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছে। যারা তাদের সমর্থন দিচ্ছে তাদের সব চক্রান্ত নস্যাত্ করে দিতে হবে।
সম্মেলনে জানানো হয়, গত কয়েক মাস ধরে জামায়াত-শিবিরের সহিংসতা, পুলিশের ওপর হামলা, সংখ্যালঘুদের বাড়ি ও মন্দির ভাঙচুর, ট্রেনে নাশকতা চালানোসহ হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি দেশের প্রতি চরম হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশকে আবার তারা পাকিস্তানে পরিণত করতে চায়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধসহ ৫ দফা দাবি বাস্তবায়নে গতকাল শনিবার সকাল রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে নাগরিক সমাজের উদ্যোগে জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
এতে দেশের প্রথিতযশা সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিল্পী, আইন বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব, নারী সমাজের প্রতিনিধিসহ সব শ্রেণিপেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। প্রফেসর ইমিরেটাস আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অজয় রায়, ড. সনজীদা খাতুন, কামাল লোহানী, অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, সাংবাদিক আবেদ খান, অধ্যাপক এমএম আকাশ, রামেন্দু মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, শাহদীন মালিক, অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার প্রমুখ। জাতীয় সম্মেলনের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন মুক্তিযোদ্ধা ডা. সারওয়ার আলী।
ঘোষণাপত্রে তিনি বলেন, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি আজ গভীর সংকটে, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী বাংলাদেশ পরাজিত শক্তিদ্বারা আক্রান্ত। জামায়াত-শিবির চক্র সারাদেশে সন্ত্রাসী, নাশকতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। শতাধিক মন্দির ও শহীদ মিনার ভাঙচুর করেছে। জাতীয় পতাকা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করেছে। রেললাইন উপড়ে ফেলেছে, যাতায়াত ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করেছে। ধর্মের নামে বিভ্রান্তি চালানোর জন্য মসজিদকে ব্যবহার করছে। এসব অপতত্পরতার বিরুদ্ধে জাতীয় সম্মেলন থকে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হচ্ছে:জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিহত করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নেয়া, মুক্তচিন্তার পথ খোলা রাখা, তালেবানি রাষ্ট্র বানানোর পাঁয়তারা প্রতিহত করে নারী অধিকার সমুন্নত রাখা। সম্মেলন শেষে জাতীয় সম্মেলন থেকে জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে—প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান, বিভাগীয় সদরে নাগরিক সমাবেশ, আলোচনা ও মতবিনিময় সভা এবং সব নাগরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে অংশগ্রহণ।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান শহীদদের রক্তে লেখা। জামায়াতের জন্য এ সংবিধান কলংকিত হতে পারে না। এদের বিরুদ্ধে আদর্শিক সংগ্রামে যাওয়া আমাদের প্রত্যেকের যেমন কর্তব্য, তেমনি জঙ্গিবাদী দল হিসাবে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার আন্দোলনে সক্রিয় হওয়াও আমাদের কর্তব্য।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে লাভ হবে না। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। তা না হলে জামায়াত ভিন্ন নামে রাজনীতিতে ফিরে আসবে। তিনি বলেন, রাজনীতি আজ দুই ভাগে বিভক্ত। একভাগে ক্ষমতার রাজনীতি, অন্যভাগে রয়েছে মুক্তির রাজনীতি। ক্ষমতার রাজনীতিকরা নানান অস্ত্র ব্যবহার করে। ধর্মও তাদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হয়। একাত্তরের পরাজিত শক্তি জামায়াত-শিবিরের এই দেশে থাকার অধিকার নেই। কিন্তু, মর্মান্তিক সত্য হচ্ছে, তারা আজ এমন দাবি তুলছে- যা পাকিস্তানেও সম্ভব ছিল না।
ছায়ানট সভাপতি ড. সন্জীদা খাতুন বলেন, আন্দোলন সমাধানের কোন পথ নয়। কিন্তু যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখন আন্দোলনের বিকল্প নেই। স্বাধীনতা নিরন্তর সাধনার বস্তু। মুক্তিযুদ্ধে জয় পেয়ে আমরা মনে করেছিলাম স্বাধীনতা পেয়ে গেছি। প্রকৃত অর্থে আমরা কখনোই স্বাধীন হইনি। স্বাধীনতা মানুষের মনে। যা অর্জন করতে হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে হলে যার যার অবস্থান থেকে মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। নিজেদের দাবি বাস্তবায়নের পথ নিজেদেরই তৈরি করতে হবে।
অজয় রায় বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আজকের মত শংকাবোধ করিনি। শাহবাগ আন্দোলনের তরুণ প্রজন্মরা প্রতিবাদ- আন্দোলন করছে। তবু শংকা কাটছে না। সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত আন্দোলন ছাড়া মৌলবাদীদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা সম্ভব হবে না।
সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী বলেন, সবাই মিলে সংঘবদ্ধভাবে মৌলবাদী গোষ্ঠীকে প্রতিহত করতে হবে। মৌলবাদী গোষ্ঠীদের পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী। এদের প্রতিহত করতে সবাইকে একযোগে পথে নেমে আসতে হবে।
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বলেন, সভ্যতার মূল কথা জঙ্গল পরিষ্কার করে জনপদ সৃষ্টি। সেই জনপদকে জঙ্গলে পরিণত করতে চাইছে জামায়াতে ইসলাম ও হেফাজতে ইসলাম। এ লড়াই সংস্কৃতির শক্তি দিয়ে প্রতিহত করতে হবে। যা দেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তিকে বেগবান করবে। আইন ও সালিশ কেন্দে র নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, মৌলবাদীদের সামপ্রদায়িক আক্রমণ রুখে দাঁড়াতে হবে। তা না হলে এই দেশ একদিন তালেবানী রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
সাহিত্যিক ও অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, হেফাজতের ১৩ দফা মানলে দেশ তেরশ বছর পিছিয়ে যাবে। দেশ, সমাজ যে কত বিপজ্জনক হতে পারে- তা আমরা মুক্তিযুদ্ধে দেখেছি। তাই আজ কোনকিছুতেই ভয় পাই না। আমাদের তরুণরা মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায় উঠে দাঁড়িয়েছে। বিজয় আমাদের হবেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে সারা জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ। এই চেতনা বাস্তবায়নে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো সৃষ্টি করা হচ্ছে, তার সবই কৃত্রিম। এগুলো দূর করতে হবে। সাংবাদিক আবেদ খান সরকারের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, আপসপ্রিয়তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইছে সরকার। সাম্প্রদায়িকতার আচ্ছাদনে ধর্মীয় চেতনা ছড়িয়ে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী যে অরাজকতা ছড়াচ্ছে তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের চেষ্টা। অথচ সরকার এই গোষ্ঠীর সঙ্গে আপস করতেই বেশি আগ্রহী। গত ৪২ বছর ধরে তা টের পাচ্ছি।
হেফাজতে ইসলামকে জামায়াতে ইসলামীর ‘সামাজিক প্রতিষ্ঠান’ উল্লেখ করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, হেফাজতে ইসলাম জামায়াতের পরিপূরক হিসাবে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, দেশ আজ জাতি রাষ্ট্র ও ধর্ম রাষ্ট্র এ দুই ভাগে বিভক্ত। এ লড়াইকে পাশ কাটানোর কোন উপায় নেই। অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, জামায়াতকে স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বিএনপি দায় এড়াতে পারে না। বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্নে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের ক্ষেত্রে কোন আপসের অবকাশ নেই। শাহদীন মালিক বলেন, একটি যৌক্তিক ডানপন্থি দল হিসেবে বিএনপি টিকে থাকুক। জামায়াত হেফাজতের বিএনপি হয়ে যাবেন না। তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গ না ছাড়লে তারা আপনাদের খেয়ে ফেলবে। আমরা চাই না, আপনারা বিলীন হয়ে যান।
গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, শাহবাগের আন্দোলনে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সমর্থন দিয়েছেন, অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। দেশের সবাইকে নিয়ে অসামপ্রদায়িক চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়বো আমরা। শাহবাগের সামপ্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনকে বার বার বিতর্কিত করার অপচেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার। এ জন্য তিনি মাহমুদুর রহমানকে দায়ী করে বলেন, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এই বিতর্কের নায়ক। পত্রিকাটি মিথ্যা-বানোয়াট তথ্য পরিবেশন করে দেশে সামপ্রদায়িক দাঙ্গা বাধাতে চেয়েছেন। আমরা আগে থেকেই তাকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। তাকে আগেই গ্রেফতার করা হলে এত সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো না।
