অফিসের পিসিতে কোনো একটি কাজ করেছিলেন, পুরোটা করে শেষ করতে পারেননি। এখন ছুটির দিনে অলস সময়ে বসে সেই কাজগুলো এগিয়ে নিতে চান। কিন্তু হাজার খুঁজেও পেন ড্রাইভটা কোথাও খুঁজে পাচ্ছেন না। সেই মুহূর্তে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে অনলাইন স্টোরেজ সুবিধা। অনলাইনে এমন হাজারো ভার্চুয়াল ড্রাইভের মধ্যে একটা হলো ড্রপবক্স। তরুণ ডেভেলপার ড্রিউ হাউসটনের প্রজেক্ট, ‘ড্রপবক্স’ নিয়ে আজকের আয়োজনটি লিখেছেন প্রাঞ্জল সেলিম
গল্পের শুরুটা পেনড্রাইভ নিয়ে হাউসটনের। এক তরুণ শিক্ষার্থী পেনড্রাইভ নিয়ে জটিল এক সমস্যায় পড়েছিলেন। স্কুলের প্রজেক্ট জমা দেওয়ার দিন প্রায় চলে এসেছে। অন্য সবার মতো তার মধ্যেও উত্তেজনা কাজ করছে তার প্রজেক্ট নিয়ে। এরই মধ্যে হঠাত্ করে আবিষ্কার করলেন তিনি তার পেনড্রাইভটি খুঁজে পাচ্ছেন না। সমস্যাটা আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিলো যখন তিনি বুঝতে পারলেন তার প্রজেক্টের সব ব্যাকআপ রাখা ছিল পেনড্রাইভে। পরে অবশ্য একটু শ্রম দিয়ে তিনি তার প্রজেক্ট দাঁড় করাতে পেরেছিলেন। তবে এই ব্যাপারটি তাকে পরবর্তীতে তার ক্যারিয়ারের সফলতার সিঁড়ি বেয়ে একধাপ এগিয়ে নেয়। কারণ সেই পেনড্রাইভ হারানো ছেলেটি আর কেউ নন, সম্প্রতি সফল অ্যাপস হিসেবে ছড়িয়ে পরা ড্রপবক্সের প্রতিষ্ঠাতা ড্রিউ হাডসন। এমআইটির এই শিক্ষার্থী এমনই পেনড্রাইভ হারানোর বিড়ম্বনায় পড়েছিলেন। তখন থেকেই তিনি এ বিষয়ে ভাবতে শুরু করলেন। তার ভাবনা থেকেই জন্ম নিলো ড্রপবক্স নামের অনলাইন ভার্চুয়াল ড্রাইভ। অবশ্য সফটওয়্যারটির বানানোর শুরুতেই সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়নি। সালটা ছিল ২০০৬, তিনি নিজের কাজে ব্যবহার করতেন এই অনলাইন স্টোরেজটি। অবশ্য এই সেবাটিকে শুধুমাত্র স্টোরেজ বা ভার্চুয়াল ড্রাইভ না বলে ওয়েবসাইটও বলা যায়। কারণ এতে পুরো ওয়েবসাইটের ইন্টারফেস দেওয়া হয়েছে। এই সেবা সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয় ঠিক একবছর পর, ২০০৭ সালে। তরুণ হাউসটনের জন্ম ১৯৮৩ সালে ম্যাসাচুসেটসে। তিনি বক্সবোরো রিজিওনাল হাই স্কুলে পড়াশোনা শেষে ভর্তি হন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি তৈরি করেন ড্রপবক্স নামের অনলাইনে ফাইল শেয়ারিং সাইট। অনলাইনে নিরাপদে তথ্য বিনিময় করতে সহায়ক ভূমিকা রাখায় অল্প সময়ের মধ্যেই ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সাইটটি। বর্তমানে ড্রপবক্সের প্রধান নির্বাহী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন হাউসটন।
ড্রপবক্সের ইতিকথা
ড্রপবক্স একটি ফাইল হোস্টিং সার্ভিস যা ড্রপবক্স ইনকর্পোরেশন নামক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত হয়। সার্ভিসটি একই সাথে ক্লাউড স্টোরেজ, ফাইল সিনক্রোনাইজেশন এবং ক্লায়েন্ট সফটওয়্যার সার্ভিস দিয়ে থাকে। ড্রপবক্স তাদের ব্যবহারকারীদের নিজস্ব কম্পিউটারে একটি নির্দিষ্ট ফোল্ডার তৈরি করতে দেয় যেটি ড্রপবক্স সিনক্রোনাইজড করে থাকে যাতে ব্যবহারকারী পরবর্তীকালে যে কম্পিউটারই ব্যবহার করুক না কেন, তারা যেন সেই ফোল্ডারটি (ফোল্ডারের ভিতরে থাকা সমস্ত ফাইল বা ম্যাটার) হুবহু ব্যবহার করতে পারে। এই ফোল্ডারে থাকা ফাইলগুলো ওয়েব সাইট কিংবা মোবাইল ফোন অ্যাপ্লিকেশনের সাহায্যেও ব্যবহার করা যায়। অর্থাত্ এই সাইটের মোবাইল প্ল্যাটফর্মও রয়েছে।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা এমআইটির গ্র্যাজুয়েট ড্রিউ হাউসটন এবং আরাশ ফেরদৌসী ২০০৭ সালে একটি ওয়াই কম্পিনেটর সার্টআপ কোম্পানি হিসেবে ড্রপবক্স ইনকর্পোরেশন প্রতিষ্ঠান করেন। ড্রপবক্স মাইক্রোসফট উইন্ডোজ, অ্যাপল ইনকর্পোরেশন, ম্যাক ওএসএক্স, লিনাক্স, গুগল অ্যান্ড্রয়েড, অ্যাপল আইওএস, ব্ল্যাকবেরি ওএস এবং ওয়েব ব্রাউজারগুলোর জন্য ক্লায়েন্ট সফটওয়্যার সরবরাহ করে থাকে।
ড্রপবক্সের আইডিয়াটি এসেছে এর প্রতিষ্ঠাতা ড্রিউ হাউসটনের মাথা থেকে। তিনি যখন এমআইটির শিক্ষার্থী ছিলেন তখন প্রায়ই ইউএসবি ফ্ল্যাশ ড্রাইভটির কথা ভুলে যেতেন। তখনকার সময় এ-সম্পর্কিত সার্ভিসগুলোর দুর্বলতা ছিল—ইন্টারনেট পর্যাপ্ততা, বড় ফাইল আপলোডের সমস্যা, বাগ ইত্যাদি। তিনি তাই নিজের জন্য কিছু একটা সমাধানের কথা চিন্তা করছিলেন। সেসময়ই তিনি ভাবলেন অন্য যারা একই সমস্যা পোহাচ্ছে তারাও তার সমাধান থেকে উপকৃত হতে পারে। হাউসটন তখন ২০০৭ সালের জুনে ড্রপবক্স ইনকর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই ওয়াই কম্বিনেটর থেকে বিনিয়োগ সংগ্রহ করে উদ্যোগটিকে সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা করলেন।
ইভেনফ্লো (ড্রপবক্সের শুরুর দিকের মূল কোম্পানি নাম) এবং প্রক্সি ইনকর্পোরেশনের মধ্য ট্রেডমার্কজনিত জটিলতার কারণে ২০০৯-এর অক্টোবর পর্যন্ত ড্রপবক্সের অফিসিয়াল ডোমেইন নাম ছিল গেট ড্রপবক্স ডট কম, তারপরই তারা নতুন অর্থাত্ বর্তমান ড্রপবক্স নামে কাজ শুরু করেন তারা।
২০১০ সালের মে মাসে চীনের ড্রপবক্স ব্যবহারকারীরা ড্রপবক্স ব্যবহার করতে গিয়ে দেখে যে তারা এটি ব্যবহার করতে পারছে না। পরবর্তী সময়ে ড্রপবক্স জানায় যে, চীন সরকার সেদেশে ড্রপবক্স ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে। ড্রপবক্সের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা খুব দ্রুতই তাদের সার্ভিসকে আরও জনপ্রিয় করে তুলে এবং বিশ্বব্যাপী ব্যবহারকারীদের কাছে পরিচিত করে দেয়। অক্টোবর ২০১১ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ড্রপবক্সের ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০ মিলিয়নেরও বেশি। ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে ড্রপবক্স তাদের ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন একটি ফিচার নিয়ে আসে। এই ফিচারের বদৌলতে ড্রপবক্স ব্যবহারকারীরা তাদের ক্যামেরার ছবি কিংবা ভিডিও সরাসরি ক্যামেরা, ট্যাবলেট, এসডি কার্ড বা স্মার্টফোন থেকে সরাসরি তাদের অ্যাকাউন্টে আপলোড করতে পারে।
২০১২ সালের সে্বেম্বর মাস থেকে ফেসবুকের গ্রুপ ব্যবহারকারীদের তাদের ফেসবুক গ্রুপের ফাইলগুলো ড্রপবক্সের মাধ্যমে ক্লাউভ-ভিত্তিক সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। এই ফিচারের কারণে ব্যবহারকারীরা তাদের ফেসবুক গ্রুপে সরাসরি না থেকেও গ্রুপের ফাইল বা পৃষ্ঠাগুলো শেয়ার বা ব্যবহার করতে পারবে। এটা অবশ্য ফেসবুকের নির্ধারিত আপলোডিং ফিচারের বিকল্প নয় কিন্তু এর মাধ্যমে ইতোমধ্যে ড্রপবক্সের অ্যাকাউন্টে থাকা কোনো ফাইল এই পদ্ধতিতে সরাসরি ফেসবুকে শেয়ার করা যাবে। ড্রপবক্সের সার্ভার এবং ডেক্সটপ সফটওয়্যার দুটোই প্রাথমিকভাবে পাইথনে প্রোগ্রামিং ভাষায় লেখা।
