সাম্প্রতিক সময়ের একটি আলোচিত নাম নাদিয়া শারমিন, যিনি গত ৬ এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হন। হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা তাকে শুধু ‘নারী’ বলেই সমাবেশস্থলে কয়েকদফা বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে। নারীদের উপর নির্যাতনের ঘটনা অবশ্য নতুন কিছু নয়; ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদেরকে অবমাননার ইতিহাস এ উপমহাদেশে প্রাচীন। তবে দুঃখজনক এ কারণেই যে, বহু কাঠ-খড় পুড়িয়ে নারীরা যখন সবখানে কৃতিত্বের সঙ্গে জায়গা করে নিচ্ছেন, তখনও অর্থাত্ এই একবিংশ শতাব্দীতে এ ধরনের বর্বরোচিত ঘটনা কোনভাবেই মেনে নেয়ার মতো ছিল না। মেনে নিতে পারেওনি জাতি। নাদিয়া শারমিনের উপর ঘটে যাওয়া এই বর্বরোচিত ঘটনায় দেশ-বিদেশে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বিষয়টি দফায় দফায় আলোচিত হয়েছে দেশি-বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমেও।
নাদিয়া শারমিনের ভাষ্যঃ ‘নাদিয়া শারমিনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, হেফাজতে ইসলামের হাতে লাঞ্ছিত হয়ে দমে যাওয়ার মেয়ে আমি নই; পেছন ফিরে যাওয়ার জন্যে আমার জন্ম হয়নি। হেফাজতের কর্মীরা সাংবাদিক সম্মেলন করে ওই ঘটনার জন্যে ক্ষমা চেয়েছেন। তারা বলেছেন যে কতিপয় দুর্বৃত্ত এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে। নাদিয়া শারমিন বলেন, বিষয়টা যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে হেফাজতের কর্মীরা কেন সেই দুর্বৃত্তদের গ্রেফতারের দাবি চেয়ে, বিচার চাইছে না? তাদের দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করে একজন নারীর গায়ে হাত তোলার জন্যে সেই দুর্বৃত্তদের বিচার হওয়া কী উচিত নয়? তিনি আরো বলেন, একজন নারীকে ৫০-৬০ জন পুরুষ লাঞ্ছিত করলো, আর সমাবেশের লাখো কর্মীর মধ্যে কেউ সহযোগিতার হাত বাড়ালো না! তারা যদি একজন নারীর নিরাপত্তা দিতে না পারে, তাহলে দেশের এতো নারীর নিরাপত্তা দিবে কি করে? আর ইসলামকেই বা হেফাজত করবে কি করে? এই প্রশ্ন রেখে নাদিয়া শারমিন বলেন, অনেকে আমার পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, দয়া করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া ভিডিও ফুটেজ দেখুন। সেদিন লম্বা কামিজ আর বড় ভারি কাপড়ের ওড়না পরেও আমি তথাকথিত ধর্মপ্রাণ ওই লোকদের হাত থেকে রেহাই পাইনি। আমার নানী হাসিনা আশরাফ-এর সময় বলা হতো, ‘সালোয়ার কামিজ পরে সাংবাদিকতা করা যাবে না’। ইসলামসহ সব ধর্মে নারীদের যে সম্মান দিয়েছে তা কী এখন হেফাজতে ইসলাম দিতে পারছে? হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে একজন নারীকে অর্ধশত লোক মিলে পিটিয়ে, রাস্তায় ফেলে তার জামা-কাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলার ইতিহাস কি কোন ধর্মে আছে? তাহলে এসব হেফাজতকারী কোন ধর্মের হেফাজত করতে নেমেছে তা আমার বোধগম্য নয়! হেফাজতকারীরা এসব প্রশ্নের জবাব দেবেন কি? নাদিয়া বলেন, হেফাজতে ইসলামের ক্ষমা চেয়ে লাভ তখনই গ্রহণযোগ্য হবে,যখন হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের সংবাদ সংগ্রহ করতে আমি যাবো এবং তখন যদি তারা আমাকে স্বসম্মানে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় তাহলেই তাদের ক্ষমা গ্রহণযোগ্য হবে।
নারী সাংবাদিকতার শুরুঃ বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকতার গোড়াপত্তন করেন নূরজাহান বেগম। যিনি ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক। তার শুরুটা হয়েছিল ১৯৪৫ সালের দিকে। নূরজাহান বেগমের পত্রিকার কাজের হাতেখড়ি হয় বাবা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের ‘সওগাত’ পত্রিকায় বাবাকে সহযোগিতা করার মধ্যদিয়ে। এরপর ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কোলকাতার ১২নং ওয়েলেসলি স্ট্রিটের বাড়িতে প্রথম সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তখন বেগম পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল, নূরজাহান বেগম ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। ‘বেগম’ পত্রিকায় লেখালেখির মধ্যদিয়ে অনেক নারী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সাংবাদিকতার কাজে এগিয়ে আসেন। তাদের একজন সাংবাদিক ‘দিল মনোয়ারা মনু’। যার শুরুটা হয়েছিল সত্তরের দশকে। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ‘বেগম’ পত্রিকায় লেখালেখির কাজ শুরু করি, এরপর ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকায়। কাজ করতে গিয়ে যেটা দেখেছি, প্রথমত পুরুষরা বিশ্বাস করতে চান না যে, নারীরা ভালো কাজ করতে পারে, তবে ভালো কাজ করে দেখাতে পারলে অবশ্য পুরুষরা সহযোগিতা করেছে। এ বিষয়টি শুধু যে পুরুষের ক্ষেত্রে ঘটেছে তা নয়; এটা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা গেছে। তিনি বলেন, অনেক প্রতিবন্ধকতার ভেতর দিয়ে ধাপে ধাপে প্রমাণ দিতে হয়েছে যে, ‘নারীরাও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে’। নারী সাংবাদিকদের সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ছিল বেশি। আমি যখন পাক্ষিক ‘অনন্যা’য় কাজ করি, সে সময় পেষ্টিং-এর দিন বাসায় ফিরতে বেশ রাত হয়ে যেত। রাত করে একটা মেয়ে বাড়ি ফিরবে, এটা প্রতিবেশীরা যেন কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। আমি বাসায় ফেরার সময় আশপাশের বাড়ির দরজা খোলার শব্দ পেতাম। তারা আমাকে আড়াল থেকে দেখতো, ‘একটা মেয়ে মধ্যরাতে চাকরি থেকে বাসায় ফেরে’। সেটা আবার কেমন চাকরি! সবাই ভালো চোখে দেখতো না বিষয়টা। কিন্তু যখন দিন গড়ালো প্রতিবেশীরা জানতে পারলো, আমি আসলে নিয়ম করেই বিশেষ দিনে দেরিতে বাসায় ফিরছি এবং পত্রিকায় ‘বাল্য বিবাহ’র কুফল’, ‘যৌতুক প্রথা’র বিপক্ষে লিখছি, ভালো কাজ করছি, তখন আশপাশের যে লোকজন আড় চোখে দেখতো, তারা আবার সমীহ করতে শুরু করলো। রাতে ফেরার পথে জেগে থাকা পানের দোকানদার ছেলেটিও এগিয়ে আসত সহযোগিতা করতে।’
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শুধু নূরজাহান বেগম কিংবা শুরুর দিকের নারী সাংবাদিকরাই নন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে যুগ যুগ ধরে নারীরা তাদের নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে ভালো কাজ দিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন সাংবাদিকতা পেশায়। তাদেরকে ঘরে বন্দী করে রাখা সম্ভব না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন বলেন, সম্প্রতি সময়ে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেসব নারী সাংবাদিক আহত হয়েছেন তার নিন্দা জানানোর ভাষা আসলে আমাদের জানা নেই। তিনি বলেন, আমাদের দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল আসলে নারীদের ঘরে বসিয়ে রাখার পক্ষে নন। তবে হেফাজতের ভূমিকাটি কিন্তু একেবারেই ভিন্ন। তারা মঞ্চে ঘোষণা দিয়েই বলেছে, নারীনীতি, শিক্ষানীতি, নারীদের অবাধ বিচরণ, এসব বিষয়ে কাজ করবে না। নারীকে যদি মানুষ হিসেবে না দেখে কেবল নারী হিসেবেই দেখা হয়, তাহলে অবাধ বিচরণের কথা আসে না। হেফাজত শুধু নারীর ক্ষেত্রে ‘ব্যভিচার’, ‘বেহায়াপনা’ এসব কুরুচিপূর্ণ শব্দ একই ক্লোজের মধ্যে যখন জুড়ে দেন, তখন স্পষ্টতই বোঝা যায় যে এই শক্তিটি আসলে নারীদের ঘরে আটকিয়ে রাখার পক্ষে। আর তাদের এসব ঘোষণার পরও যদি নারী বাইরে কাজ করতে আসে তাহলে তাদের পরিণতি কী হবে তা তারা বুঝিয়ে দিয়েছেন, নাদিয়া শারমিনসহ নারী সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আঘাত করে। তিনি বলেন, নারীদের বাইরের কাজে বাধা দিতেই এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। কিন্তু নারীরা দীর্ঘদিন ধরে যে যোগ্যতার সঙ্গে এগিয়ে এসেছে তাতে আঘাত করে তাদের কোনভাবেই দমানো সম্ভব নয়। নাদিয়া শারমিনের ওপর হেফাজতের এই আঘাত বুমেরাং হয়ে ফিরবে। তিনি বলেন, মেয়েদের ভয়ের কিছু নেই, হারাবারও কিছু নেই, সামনের পৃথিবী নারীদের।
