আজ ২২ এপ্রিল উত্তর ফটিকছড়ির হাসনাবাদ গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এদিনে পাক হানাদার বাহিনী এদেশীয় দালাল রাজাকারদের সহায়তায় হত্যা করেছিল ২২ জন মুক্তিকামী মানুষকে। অথচ স্বাধীনতার ৪১ বছরেও শহীদের তালিকায় স্থান পায়নি ফটিকছড়ি গণহত্যার শিকার ২২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ইতিহাসের পাতায় লেখা নেই এসব বীর শহীদদের নাম। বিস্মৃতির অতলান্তে তলিয়ে গেছে এমন ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের কথা। এসব শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়নি কোন স্মৃতিসৌধ। ১৯৭১ সালের ২২ এপিল এ গ্রামে পাক হানাদাররা কেবল ২২ জন মানুষকেই হত্যা করেনি। সেই সাথে আগুনে ঘরবাড়ি পুডিয়ে, নারী ধর্ষণ করে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল শান্ত জনপদ হাসনাবাদ গ্রামটি।
উত্তর ফটিকছড়ির নারায়ণহাট ও শান্তিরহাটের মাঝামাঝি ফটিকছড়ি হেয়াকো (তত্কালীন রামগড় রোড) সড়কের পাশেই হাসনাবাদ প্রাম। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর পাক আর্মির আক্রমণের মুখে সমগ্র চট্টগ্রামের বাঙ্গালি সেনা সদস্য ইপিআরসহ মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতে যাবার এটিই ছিল একমাত্র পথ। সেই সাথে হাজার হাজার শরণার্থী রামগড় রোড দিয়েই ভারতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে উক্ত গ্রামের সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি শহীদ আমিনুল হক চৌধুরী ও মরহুম আবু তাহের চৌধুরী ভ্রাতৃদ্বয় মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের সাধ্যমত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমনকি মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তত্কালীন ১নং সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলাম বীরোত্তম, লে. শওকত, ক্যাপ্টেন কাদের, মীর্জা আবু মনসুরসহ মুক্তিযুদ্ধের অনেক বীর সেনানী এ পথ দিয়ে যেতে উক্ত চৌধুরী বাড়িতে যাত্রা বিরতি করেছেন বলে জানা যায়। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই স্থানীয় রাজাকারদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয় উক্ত বাড়ি এবং চৌধুরী ভ্রাতৃদ্বয়। এ খবর রাজাকারদের মাধ্যমে পাক আর্মির কানে চলে যায়। ১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল বৃহস্পতিবার পাক বাহিনী ক্রমশ এগিয়ে এসে হাসনাবাদ গ্রামের অদূরে রামগড় রোডের পাশে নন্দীর স্কুলে ক্যাম্প স্থান করে। সকাল ১০-১১টার দিকে পাক আর্মিরা প্রথমে একটি সেল উক্তবাড়ী লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারে। সেলটি আমিনুল হক চৌধুরীর আঙ্গিনায় বিস্ফোরিত হয়। উক্ত বাড়ির সামনে বটগাছের নিচে থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমদ ছাপা পাক বাহিনীকে লক্ষ্য করে হ্যান্ডগ্রেনেড ছুঁড়ে মারে। অতপর ৩০-৪০ জন পাক আর্মির একটি দল দ্রুত গুলি করতে করতে উক্ত বাড়িতে চড়াও হয়। বাড়িতে ঢুকতে প্রথমে আমিনুল হক চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করে তারা। এরপর ঐ বাড়ির ৭ জন মানুষকে হত্যা করে পাকবাহিনী। সেখান থেকে আবুল কাশেম নামে এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েও কোন রকমে প্রাণে বেঁচে যান। এরপর আমিনুল হক চৌধুরী ও আবু তাহের চৌধুরীর ঘরে গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। পাকবাহিনী এরপর হাসনাবাদ চৌধুরী বাড়ির পশ্চিমে উল্টো ভিটা গ্রামটি চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে।
এরপর তারা ২ মহিলাসহ আরো ১৪ জনকে উক্ত গ্রামের আজিজুর রহমানের পুকুর পাড়ে এনে লাইন করে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। সেখানে বুকের বাম পাশ গুলি খেয়েও বেঁচে যান মাওলানা মনির ্আহমদ।
এ ঘটনার কয়েকদিন পর স্থানীয় রাজাকাররা বাগে পেয়ে পাক সেনাদের প্রতি প্রথম বোমা নিক্ষেপকারী মুক্তিযোদ্ধা আহমদ ছাপাকে গুলি করে হত্যা করে। তিনি উক্ত গ্রামের মিয়া পাড়ার বাচ্চু মিয়ার পুত্র। সেদিন পাক হানাদারদের হাতে নিহত হওয়া ২২ জন শহীদের মধ্যে শুধু শহীদ আহমদ ছাপার নামটি শহীদের তালিকায় রয়েছে। বাকি ২১ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত নেই। ফটিকছড়ি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বোরহান উদ্দিন চৌধুরী জানান, ফটিকছড়িতে মোট ৮টি বধ্যভূমি রয়েছে। আমরা সেগুলো সংরক্ষণের ব্যাপারে প্রশাসনকে জানিয়েছি।
