সুশীলরা ব্যর্থ, নয়া প্রস্তাবের লক্ষ্য আমাকে মাইনাস করা

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৩, ২২:২৭
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নতুন নতুন ফর্মুলা ও সুপারিশের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ এবং আমাকে মাইনাস করার জন্য এসব ফর্মুলা দেয়া হচ্ছে। যারা অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন, তাদের এখনকার কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠক সূত্র একথা জানিয়েছে। গতকাল রবিবার আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের বিভিন্ন ফর্মুলা রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সুশীল সমাজ নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে এখন আগামী নির্বাচনের জন্য একের পর এক নির্বাচনী ফর্মুলা দিয়ে যাচ্ছে। এখন যারা বিভিন্ন প্রস্তাব দিচ্ছেন, তারাই তো একটি নির্বাচন করতে পারেননি। তারা নিজেরা ব্যর্থ হয়ে এখন ফর্মুলা দিচ্ছেন কীভাবে? প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাদের কাজ রাজনীতি করা নয়; তারা একের পর এক রাজনৈতিক বিভিন্ন দিক নিয়ে ফর্মুলা দেয়। আর রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে। তাদের অনেকে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ব্যর্থও হয়েছেন। তারা ওয়ান ইলেভেনে ষড়যন্ত্র করেছেন। এখনো ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগকে তাদের পছন্দ হয় না। ওয়ান ইলেভেনে মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল, পারেনি। মূলত মাইনাস টু’র নামে তখনো ছিল মাইনাস ওয়ান। আওয়ামী লীগকে মাইনাস করা। আওয়ামী লীগ তাদের পছন্দ নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মূলধারার রাজনীতি থেকে বিএনপি ও খালেদা জিয়া মাইনাস হয়ে গেছে; এখন তারা আওয়ামী লীগকে মাইনাস করতে চায়। ষড়যন্ত্রকারীরা অতীতেও সফল হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মানবাধিকার রিপোর্ট প্রসঙ্গে বলেন, মানবাধিকার কারা লংঘন করছে। যখন মানুষ মারছে, সম্পদ নষ্ট করছে, অগ্নিসংযোগসহ ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করে বেড়ায় তখন মানবাধিকার কর্মীরা কথা বলেন না কেন? তখন কোথায় থাকেন তারা। আওয়ামী লীগ সভাপতি দলের সকল সংসদ সদস্যকে নিজ নিজ এলাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে নির্দেশ দেন। তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে যে কোনো ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেন, বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের নাশকতার বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। বৈঠকে সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য নাজমা আক্তার স্পিকার নির্বাচিত করার প্রসঙ্গ তোলেন। এ সময় সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, একজন সদস্যকে অবশ্যই জানতে হবে কখন স্পিকারের প্রসঙ্গ আনা উচিত। কারণ আবদুল হামিদকে রাষ্ট্রপতির জন্য মনোনয়ন দেয়া হলেও স্পিকারের পদটি এখনো শূন্য হয়নি। সূত্র জানায়, স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করার জন্য রাষ্ট্রপতির গেজেট জারির পর সংসদীয় দলের আরেকটি বৈঠক করে সেখানে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সংসদ সদস্য জানান, বৈঠকের পুরো সময়জুড়ে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর মন খারাপ ছিল। আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগ বাড়ানোর জন্য নিদের্শনা দেন সংসদ নেতা। শেখ হাসিনা বলেন, দল ছাড়া জনপ্রতিনিধির কোনো শক্তি নেই। দল পাশে থাকলে সব কিছু করা সম্ভব। ‘রাজনীতিবিদদের দেশ থেকে বিসর্জনের চেষ্টা হয়েছিল’ ইত্তেফাক রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেছেন, ওয়ান ইলেভেনের পর বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনীতিবিদদের দেশ থেকে বিসর্জনের চেষ্টা হয়েছিল। তাদের হাত থেকে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ছাত্র সমাজসহ সকলে নির্যাতিত হয়েছেন। তাদের সেই নির্যাতনের কথা দেশবাসী ভুলে যায়নি। অনেকে মনে করেছিল, গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার হয়তো আর ফিরে পাবো না। অবশ্য সে সময় জিল্লুর রহমান বলিষ্ঠ ভূমিকা না রাখলে দেশে গণতন্ত্র ফিরে পেতাম না। গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদের ১৭তম অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য আব্দুল জলিলের মৃত্যুতে সংসদে উত্থাপিত শোক-প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের জন্য জিল্লুর রহমানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। তিনি আরো কিছু দিন বেঁচে থাকলে দেশের জন্য অনেক উপকার হতো। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ক্রান্তিলগ্নে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান গণতন্ত্র পুনর্রুদ্ধার করেছেন। রাজনীতিকে যখন দেশ থেকে বিসর্জন দেয়ার অপচেষ্টা চলছিলো তখন তিনিই গণতন্ত্রের পক্ষে হাল ধরেন। তাঁর প্রতি জাতি সশ্রদ্ধ ও আবেগময় বিদায় জানিয়ে সেই কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসারই প্রকাশ ঘটিয়েছে। অন্যদিকে যেকোন প্রয়োজনে নেতা-কর্মীদের পাশে থেকে দল গঠনে ভূমিকা রেখেছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল। গণতন্ত্র রক্ষায় এই দুই নেতার অনুকরণীয় একাগ্রতা ও দেশপ্রেমের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। পাশাপাশি মহাজোটের সংসদ সদস্যরা তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, জাতি তাদের অবদান কখনো ভুলবে না। রবিবার নবম জাতীয় সংসদের ১৭তম অধিবেশনের শুরুতে বিধি অনুযায়ী চলতি সংসদের সদস্য আবদুল জলিলের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব আনা হয় এবং তাঁর সম্মানে অধিবেশনের কার্যক্রম মুলতবি রেখে শোক প্রস্তাবের আলোচনা শুরু হয়। সে সময় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের মৃত্যুতেও শোক প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন মহাজোটের সংসদ সদস্যরা। আলোচনায় অংশ নেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ, আমীর হোসেন আমু, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, চীফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ, রহমত আলী, ফজলে রাব্বি মিয়া, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান, জুনায়েদ আহমেদ পলক, তারানা হালিম, অপু উকিল, বেবী মওদুদ, ফজিলাতুন নেছা বাপ্পি, আশরাফুন্নেছা মোশাররফ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল, জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নুসহ মোট ৩৩ জন। পরে শোক প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করা হয়। দুই নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অধিবেশন কক্ষে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। আমির হোসেন আমু বলেন, জিল্লুর রহমান একজন নির্দলীয় নিরপেক্ষ লোক ছিলেন। এজন্য সবার কাছে তিনি গ্রহণযোগ্য ছিলেন। তার মৃত্যুতে সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিই প্রমাণ করে তার নিরপেক্ষতা। দফতরবিহীনমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, মৃত্যু যতই পীড়াদায়ক হোক তা অবধারিত। কিন্তু মৃত্যুর আগে ব্যক্তি কী করে গেছেন তা বিবেচ্য। আমাদের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানকে আমি বিভিন্ন পদে পেয়েছি। প্রতিটি পদেই তিনি ছিলেন একজন নিখাদ ভদ্রলোক। তোফায়েল আহমেদ বলেন, জিল্লুর রহমান একাধারে ভাষাসৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা ও সফল রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি একজন অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী ছিলেন। আওয়ামী লীগের জন্য তিনি তার জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ছিলেন আমাদের রাজনৈতিক শিক্ষক। তার প্রতিটি কথা থেকেই শেখার ছিল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে দেশের স্বার্থ ও মানবতার বিষয়টি প্রাধান্য পেতো। অন্যদিকে আবদুল জলিল ছিলেন একজন সত্ রাজনীতিবিদ।