বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মো. আবদুল হামিদ। রাষ্ট্রপতি পদে জমা পড়া মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ গতকাল সোমবার বেলা ১১টায় শেরে বাংলানগরে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করেন। আগামী বুধবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে আবদুল হামিদ শপথ নেবেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের স্থলাভিষিক্ত হবেন। সংবিধান অনুসারে তার মেয়াদকাল হবে শপথ নেয়ার দিন থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর। শপথ নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার স্পিকারের পদটি শূন্য হবে।
এর আগে গত রবিবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদীয় দল রাষ্ট্রপতি পদে আবদুল হামিদকে মনোনয়ন দেয়। আবদুল হামিদ সংসদ ভবনে ওই দিন দুপুরে মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করেন। পরে আওয়ামী লীগ নেতারা তা নির্বাচন কমিশনে জমা দেন।
৯ এপ্রিল নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২৯ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। গতকাল সোমবার যাচাই-বাছাই ও আগামীকাল বুধবার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন ছিল। তবে মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিন অর্থাত্ গত রবিবার আর কেউ মনোনয়নপত্র জমা না দেয়ায় গতকাল নির্বাচন কমিশন আবদুল হামিদকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত ঘোষণা করে।
এ প্রসঙ্গে গতকাল ইসি কার্যালয়ে এক ব্রিফিং-এ প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের গেজেট প্রকাশ করে তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ পড়ানোর উদ্যোগ নেবেন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবদুল হামিদের জাতীয় সংসদের স্পিকারের পদ এবং কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে। আমাদের ওপর আরেকটি দায়িত্ব আসবে ৯০ দিনের মধ্যে ওই আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করা।’ ব্রিফিংকালে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক, মোহাম্মদ আবু হাফিজ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলী, মো. শাহ নেওয়াজ, ইসি সচিবালয়ের সচিব ড. মো. সাদিক প্রমুখ। এছাড়াও সংসদীয় দলের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সরকার দলীয় চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ, অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া, আব্দুল মতিন খসরু, হুইপ আ স ম ফিরোজ প্রমুখ।
গতকালই রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন সংক্রান্ত গেজেট জারি করে তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়ে দেয় কমিশন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির নির্বাচন বিষয়ে ইসির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক স্বাক্ষরিত গেজেটে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন ১৯৯১ ( ১৯৯১ সনের ২৭ নং আইন) এর ধারা ৭ এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিধিমালা, ১৯৯১ এর বিধি ১২ এর উপ-বিধি (৬) অনুসারে নির্বাচন কমিশনারের ঘোষণা মোতাবেক জনাব মো. আব্দুল হামিদ অ্যাডভোকেট, পিতা-মৃৃত হাজী মো. তায়েব উদ্দিন, গ্রাম-কামালপুর, মিঠামইন, ডাকঘর-মিঠামইন, উপজেলা-মিঠামইন, জেলা-কিশোরগঞ্জ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হইয়াছেন।’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ৭ ধারায় বলা হয়েছে-নির্বাচনী কর্মকর্তা নির্ধারিত দিন, সময় ও স্থানে মনোনয়নপত্র পরীক্ষা করবেন। পরীক্ষার পরে একজনের মনোনয়নপত্র বৈধ থাকলে নির্বাচন কমিশন ওই ব্যক্তিকে নির্বাচিত বলে ঘোষণা করবেন। তবে একাধিক ব্যক্তির মনোনয়নপত্র বৈধ থাকলে বৈধভাবে মনোনীত ব্যক্তিদের নাম মনোনয়নপত্র পরীক্ষার দিন ঘোষণা করবেন। সে অনুযায়ী আবদুল হামিদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে সোমবারই তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
গত ২০ মার্চ অপরাহ্নে দেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান সিঙ্গাপুরে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান। এদিনই মন্ত্রিপরিষদ সচিব স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে জাতীয় সংসদের স্পিকার মো. আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেটকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি করা হয়। গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার শওকত আলীর সঙ্গে তার জাতীয় সংসদ কার্যালয়ে সিইসি সাক্ষাত্ করে ওই দিনই কমিশনে ফিরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন।
সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর ১৯৯১ সালে একাধিক প্রার্থী হওয়ায় একবারই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন সংসদ সদস্যরা। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন দল মনোনীত প্রার্থীই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
আবদুল হামিদের জীবনবৃত্তান্ত
১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কামালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল হামিদ। ১৯৫৯ সালে ছাত্রলীগে যোগ দেয়ার মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ১৯৬১ সালে কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থাতেই তিনি যোগ দেন আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে। এক পর্যায়ে তাকে কারাগারেও যেতে হয়। গুরুদয়াল কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালনের পর ১৯৬৪ সালে কিশোরগঞ্জ সাব ডিভিশনের ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব নেন আবদুল হামিদ। ১৯৬৬-৬৭ সালে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ১৯৬৯ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১৮ আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য নির্বাচিত হন আবদুল হামিদ। এরপর দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি তাতে যোগ দেন।
১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে নির্বাচিত হন আবদুল হামিদ। ১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ, ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ, ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ, ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ এবং সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সপ্তম সংসদে ১৯৯৬ সালের ১৩ জুলাই থেকে ২০০১ সালের ১০ জুলাই পর্যন্ত ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব পালনের পর ২০০১ এর ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত স্পিকার হিসেবে সংসদ পরিচালনা করেন আবদুল হামিদ। আর নবম সংসদে নির্বাচিত হওয়ার পর দ্বিতীয়বারের মতো স্পিকার হন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছর তাকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়।
পিতা হাজি মো. তায়েব উদ্দিন ও মাতা তমিজা বেগমের সন্তান আবদুল হামিদ কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে মানবিকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকার সেন্ট্রাল ল’ কলেজ থেকে এলএলবি পাস করার পর কিশোরগঞ্জ বারে আইন পেশায় যোগ দেন তিনি। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পাঁচবার জেলা বার সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তিন পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক।
