নালিতাবাড়িতে বিলুপ্তির পথে পাহাড়িদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩৪
শেরপুরের সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ী উপজেলার শেষপ্রান্ত থেকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শুরু। নালিতাবাড়ী উপজেলার পাহাড়ি এলাকাজুড়ে বহুকাল থেকে বসবাস করছে গারো, হাজং, কোচ, ডালুসহ পাঁচ-ছয়টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন। তাদের রয়েছে ঐতিহ্যবাহী নিজ নিজ সংস্কৃতি। দীর্ঘদিন তারা তাদের সংস্কৃতিকে পরম যত্নে আগলে রাখলেও আধুনিক ‘ডিজিটাল’ সংস্কৃতির চাপের মুখে এবং চরম দারিদ্র্যের কারণে পাহাড়ি এই মানুষগুলো তাদের সাংস্কৃতিক অনেক ঐতিহ্যই আজ হারাতে বসেছে। তাদের খাবারের ধরনে, আচার-আচরণে পরিবর্তন এসেছে, পরিবর্তন এসেছে ভাষাতেও। পাহাড়িদের নিজস্ব ভাষার সাথে বাংলার মিশ্রণ ঘটে গেছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর একাধিক সংগঠন সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ৭৪টি গ্রামে সহস্রাধিক পরিবারে প্রায় ৪০ হাজার পাহাড়ির বসবাস। এদের মধ্যে অন্যতম গারো, হাজং ও কোচ। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের রয়েছে আলাদা-আলাদা কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও সমাজ ব্যবস্থা। গারোরা খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী আর কোচ এবং হাজংরা সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। গারোরা মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অধীনে আজো জীবন-যাপন করছে। এদের বৃহত্ ধর্মীয় উত্সব হলো বড়দিন। এছাড়াও প্রতিবছর ষ্টার সানডে, তীর্থ উত্সব, ইংরেজী নববর্ষ, ওয়ানগালা উত্সব পালন করে থাকে তারা। আর কোচদের বৃহত্ ধর্মীয় উত্সব দুর্গা এবং কালিপূজা। এসব ধর্মীয় উত্সব ছাড়াও দুই সম্প্রদায়ই অলাদাভাবে সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। কালের বিবর্তনে এবং ডিজিটালের এই যুগে গারো, হাজং ও কোচ সম্প্রদায়ের হাজার বছরের ঐতিহ্য কৃষ্টি-সংস্কৃতি অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। জানা যায়, উপজেলার সীমান্তবর্তী পানিহাটা, তাড়ানি, ফেকামারি, মায়াঘাসি, নাকুগাঁও, দাওধারা, আন্ধারুপাড়া, খলচান্দা, বুরুঙ্গা, বাতকুচি, সমেশ্চুড়া, খলিসাকুড়ি, গাছগড়া, নয়াবিল গ্রামে কোচ ও গারো সম্প্রদায়ের লোকেরা অনাদিকাল থেকে বাপ-দাদার ভিটায় বসবাস করে আসছে। সময়ের সাথে সাথে দেশের মানুষের জীবন-যাত্রার মান বাড়লেও পাহাড়িদের ভাগ্যের তেমন কোনো উন্নয়ন ঘটেনি। তারা এখনো পাহাড়ে, অরণ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছে। পাহাড়িদের মধ্যে সবচে অনগ্রসর গোষ্ঠী হলো কোচ সম্প্রদায়। এদের স্থানীয় নেতা মি. প্রদীপ জেংচাম বলেন, বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতির অনেক কিছুই হারিয়ে যেতে বসেছে। বিশেষ করে হারিয়ে যাচ্ছে সাংস্কৃতিক বিভিন্ন উপাদান, পোশাক, বিশেষ খাদ্যদ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র। ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র মান্দিদামা, ক্রাম, খোল, নাগ্রা, জিপসি, খক, মিল¬াম, স্ফি, রাং, বাঁশের বাঁশি এখনো দেখা গেলেও আদুরী নামের বাদ্যযন্ত্র এখন আর দেখা যায় না। একইভাবে পোশাকের মধ্যে দকবান্দা, দকশাড়ী, খকাশিল, দমী, রিক মাচুল আর কোচদের রাংঙ্গা লেফেন ও আছাম এখন আর দেখা যায় না। আর খাবারের মধ্যে বাঁশের কড়ুল আর চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি খাবার ‘মিয়া’, কলাপাতায় ছোট মাছ আগুনে পুড়িয়ে তৈরি মুখরোচক খাবার ‘ইথিবা’, মুরগির বাচ্চা আগুনে ঝলসে বাঁশের চোঙ্গায় ভরে পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচ দিয়ে তৈরি ভর্তা ‘ব্রেংআ’, মিমিল, কাকড়া, শামুক ও শূকরের মাংস, চালের তৈরি মদ চু, আর কোচদের কাঠমুড়ি খাবার এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। খলচান্দা গ্রামের পরিমল কোচ (৩৪) বলেন, আমরা বন-পাহাড়ে নানা প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে জীবন-যাপন করছি। পেটের তাগিদে ইতিহাস-ঐতিহ্য বুঝি না, বুঝি শুধু বেঁচে থাকতে হবে। কোচ, গারো, হাজং—সবারই রয়েছে নিজস্ব ভাষা। এই ভাষাতেও এসে গেছে পরিবর্তন। তারা ইদানীং নিজস্ব ভাষার ফাঁকে ফাঁকে বাংলা জুড়ে দিয়ে কথা বলে থাকে। খলচান্দা গ্রামের রমেশ চন্দ্র কোচ বলেন, আমাদের কোচ ভাষায় এখন বাংলা ভাষার মিশ্রণ ঘটে গেছে। তার নিজেরও বাংলা ভাষা যোগ করা ছাড়া কথা বলতে সমস্যা হয়। ‘দুঃখকষ্ট নিয়ে পাহাড়ে জীবন-যাপন করছি’—এই কথাটি কোচ ভাষায় জানতে চাইলে তিনি সময় নিয়ে আস্তে আস্তে বলেন। আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলার জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান খলচান্দা গ্রামের শিক্ষক পরিমল কোচ। ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান মি. লুইস নেংমিনজা বলেন, আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য গত বছর ৯ আগষ্ট উপজেলা সদরে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী একাডেমী স্থাপন করা হয়েছে। এখানে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক আছেন, যিনি শুধুমাত্র গান শেখার তালিম দেন। এছাড়া নয়াবিল গ্রামে পাহাড়িদের একটি কমিউনিটি সেন্টার ও বেলতৈল গ্রামে হাজংদের জন্য আরেকটি কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণাধীন। আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা কারিতাসের পিএলএইচআর (প্রমোশন অব লাইভলিহুড এন্ড রিসোর্স প্রজেক্ট) প্রকল্পের মাঠ কর্মকর্তা মি. সুবীর দিব্রা বলেন, পাহাড়িদের সংস্কৃতিকে চর্চার মাধ্যমে ধরে রাখার জন্য কারিতাস পিএলএইচআর বারমারী ও নালিতাবাড়ী ক্লাষ্টারে ২০১১ সাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এই প্রকল্পের আওতায় ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট কমিটির (ভিডিসি) অধীনে প্রায় ৩৫টি গ্রামের ৪ হাজার লোক সরাসরি জড়িত। তাদের কেউ কেউ কারিতাস ক্লাষ্টার অফিসে এসে পাহাড়িদের নিজস্ব ভাষায় গান চর্চা করে থাকেন। কারিতাস নালিতাবাড়ীতে পাহাড়িদের ঐতিহ্য সংস্কৃতি ধরে রাখার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।