নওগাঁ জেলা সদর থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে ভারত সীমান্তবর্তী ধামইরহাট উপজেলা। ঐ উপজেলা সদর থেকে আরো ৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূবে জগদ্দল মৌজায় একটি মাঠের মাঝে অবস্থিত ঐতিহাসিক জগদ্দল বিহার। বিগত মাস ছয়েক যাবত্ এই অঞ্চলটি প্রত্নতাত্ত্বিকসহ ইতিহাস প্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই স্থান খনন করে ১২শ’ থেকে ১৩শ’ খৃষ্টাব্দে প্রচলিত বুদ্ধমূর্তিসহ বিভিন্ন প্রাচীন মূর্তি ও বহু বছরের পুরনো বিশাল আকারের কালো পাথর পাওয়া গেছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের কাস্টডিয়ান মাহবুব-উল-আলম জানান, যে ঐতিহাসিক স্থানগুলো থেকে আদি সভ্যতার নিদর্শন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন স্থানগুলো প্রতি বছর ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত খনন করা হয়। গত ডিসেম্বর থেকে জগদ্দল বিহারের এক বর্গকিলোমিটার জুড়ে খনন কাজ শুরু করা হয়। এ অর্থ বছরের মতো গত ২৮ ফেব্রুয়ারি খনন কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। আগামী বছর আবার এটি খননের কর্মসূচী রয়েছে। অর্থ বরাদ্দের পর খনন কাজ শুরু করা হবে। সবুজ-শ্যামলিমায় ঘেরা এই অঞ্চলটি নওগাঁ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে।
মাহবুব-উল-আলম জানান, জগদ্দল বিহারের আশপাশে বড় বড় অনেক মাটির ঢিবি রয়েছে। এই ঢিবিগুলোতে খনন কাজ চালিয়ে যেতে পারলে আরো অনেক বুদ্ধমূর্তি, বিভিন্ন পাথরসহ অনেক প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হতে পারে। দেশে এখন পর্যন্ত জগদ্দল বিহারেই সর্বাধিক সংখ্যক কালো ও গ্রানাইট পাথরের নিদর্শন পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে গত বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে ৪০ জন শ্রমিক দিয়ে জগদ্দল বিহারে খনন কাজ শুরু করা হয়। এরপর বিহারের মাটির ঢিবির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে একের পর এক আদি সভ্যতার নিদর্শন। খননের ফলে বেরিয়ে আসছে মূল মন্দির ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বেশ কয়েকটি কক্ষ, তিনটি বিশাল আকৃতির গ্রানাইট পাথরখণ্ড। পাওয়া গেছে গ্রানাইট পাথরে নির্মিত ১৬ ফুট স্তম্ভ। অলংকৃত বুদ্ধ মূর্তিসহ বেশ কিছু মূর্তি। পাওয়া গেছে বিভিন্ন ধরনের মৃত্ পাত্রের ভগ্নাংশ। নিদর্শনগুলো পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
কয়েকটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে ও ইতিহাসবিদ আবুল ফজলের লেখা ‘আইন-ই-আকবর’ নামক গ্রন্থ থেকে জগদ্দল বিহার সম্পর্কে বেশ কিছু মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। জানা গেছে, একাদশ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে এ জনপদে বসবাস করতো সেই সময়ের কিছু প্রভারশালী হিন্দু জমিদার পরিবার। রামপালের গৌড় রাজা বিহারটি অন্য এক রাজার কাছ থেকে পুনরুদ্ধার করে ‘রামাবতী’ নগর নামক রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। এই রামাবতির উপকণ্ঠে জগদ্দল বিহার নির্মাণ করা হয়। কালের পরিক্রমায় বিহারটি ধ্বংস হয়ে যায়। মাহবুব-উল-আলম আরো জানান, দীর্ঘ ৮-৯শ’ বছর পর সেখানে ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত মোট ৩ দফা প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্য পরিচালনা করা হয়। এর ফলে সেখানে ৮০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৭৮ মিটার প্রস্থ বিশিষ্ট চার কোণাকার পূর্বমূখী স্থাপনা ভিতের অংশ অনাবৃত হয়েছে। এর মাঝখানে রয়েছে ছাদবিহীন চাতাল এবং চারটি বাহুতে সারি সারি অপরিসর প্রকোষ্ট। উত্তর বাহু এখনও মাটির নিচে রয়েছে। দক্ষিণ ও পশ্চিম বাহুতে প্রকোষ্ঠের সংখ্যা ৮টি করে এবং পূর্ব বাহুতে আনুমানিক ৯টি প্রকোষ্ঠ রয়েছে। পশ্চিম বাহুতে প্রকোষ্ঠ ছাড়াও ঠিক মাঝামাঝি অংশে চত্বর ও পেছন দিকে প্রধান ‘মূর্তি কোঠা’ রয়েছে। এ ছাড়া চারটি কোনের প্রতিটিতে রয়েছে অপরিসর মূর্তি কোঠা। আর এ বৈশিষ্ট্যের কারণে এই স্থাপনাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ‘পঞ্চায়াতন’ মন্দির নিদর্শন বলে গণ্য করা হয়। পঞ্চায়াতন মন্দিরটির গবরাট, সরদল, দরজার বাজুবন্ধ প্রভৃতি অংশে প্রচুর পালিশ করা কালো পাথর ব্যবহূত হয়েছে। এগুলোতে নানা ধরনের রূপ চিহ্ন ও দেবদেবির (দ্বারপাল, অপসরা, বোধিসত্ব ও তথাগত) প্রতিকৃতি উত্কীর্ণ রয়েছে। এ ছাড়া ধ্বংসস্তূপ থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে কালো পাথরে উত্কীর্ণ একটি খদিরবানী তারা, একটি সম্বল, একটি স্ফিতোধর নরের ধড় অংশ এবং চুনাপাথরের উত্কীর্ণ একটি ক্ষুদ্রাকার হেবজ্র শক্তি মূর্তি। অনুরূপ একটি হেবজ্র শক্তি মূর্তি ইতিপূর্বে নওগাঁর ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বিহারে আবিষ্কৃত হয়েছিল। অন্যান্য পুরাবস্তুর মধ্যে রয়েছে পোড়া মাটির ফলক, মৃত্পাত্র, পোড়ামাটির গোলক, কারুকাজ করা ইট প্রভৃতি। পোড়ামাটির ফলকগুলোতে উত্কীর্ণ রয়েছে মানুষ ও পশুর প্রতিকৃতি। আরো পাওয়া গেছে লিপি ভাষ্য উত্কীর্ণ দু’টি পাথরের খণ্ডাংশ। এসব কিছুর মধ্যে ১২শ’ থেকে ১৩শ’ খ্রিষ্টাব্দে প্রচলিত নমুনারিতির ছাপ বজায় রয়েছে। এই মহাবিহারের প্রধান উপাস্য দেবতা ছিলেন অলোকিতেশ্বর।
