সৃজনশীল মানুষের সৃষ্টির অধিকার সুরক্ষায় দেশের কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার, সুরকার, শিল্পী ও প্রকাশকরা একটি সমন্বিত কপিরাইট আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেছেন।
‘বর্তমানে বিদ্যমান কপিরাইট আইনটি বিশ্বায়ন ও তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। সর্বত্র অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলেও কপিরাইট আইনটি নানাভাবে লংঘিত হচ্ছে। তাই সময়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ও যুক্তিসঙ্গত একটি সমন্বিত কপিরাইট আইন প্রণয়ন জরুরি,’ - দেশে বিদ্যমান কপিরাইট আইন সম্পর্কে আলোচনাকালে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বাসসকে একথা বলেন। তিনি কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার, সুরকার, শিল্পী ও প্রকাশক, চলচ্চিত্রকার ও আলোকচিত্রীসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের পৃথক পৃথক কপিরাইট সোসাইটি গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শামসুজ্জামান খান বলেন, কপিরাইট সোসাইটির সদস্যরা নিজেদের ছোট ইউনিটে আলোচনার মাধ্যমে তাদের অধিকার সংরক্ষণের প্রস্তাব করবে। পরে এসব ছোট ছোট ইউনিটের প্রতিবেদন সমন্বয় করে একটি খসড়া আইন তৈরি করে সংসদীয় কমিটির কাছে পেশ করা হবে।
বিদ্যমান আইনের অবস্থা ও প্রয়োগ সম্পর্কে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক বলেন, বিদ্যমান কপিরাইট আইনটি যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তিনি জানান, বিদ্যমান কপিরাইট আইন লংঘনের জন্য সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে জরিমানা ও বিভিন্ন মেয়াদের সাজা রয়েছে। তবে এ পর্যন্ত এ আইন লঙ্ঘনকারীকে শাস্তি প্রদানের কোন নজির এদেশে নেই। অথচ কপিরাইট লংঘনকারীরা বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত অভিধান বাংলাবাজারে প্রকাশ করে কম দামে বিক্রির ঘটনাও ঘটেছে।
শামসুজ্জামান খান কপিরাইট আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের জন্য সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরকে প্রশিক্ষিত করারও আহ্বান জানান। বাংলাদেশ কপিরাইট বোর্ডের সদস্য ও বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাবের সভাপতি কবি নুরুল হুদা কপিরাইট আইন লঙ্ঘনকে ‘বিদ্যমান আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন’ বলে উল্লে¬খ করেন। তিনি বলেন, দেশে বিদ্যমান কপিরাইট আইনটি ২০০০ সালে যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজানো হয়। এই আইনের কাঠামো ও ধারাগুলো অধিকাংশই পূর্বতন আইনের অনুরূপ। ২০০৫ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়। পরে ২০০৬ সালে একটি বিধি প্রণয়ন করা হয়।
নুরুল হুদা বলেন, গত এক দশকে কপিরাইট আইন যুগোপযোগী করার জন্য সরকার দু’বার উদ্যোগ নেয়া সত্ত্বেও এই আইনে কিছু ফাঁক-ফোকর রয়ে গেছে। তাই দেশে কপিরাইট আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৫) বলবত্ থাকা সত্ত্বেও নির্বিচারে এই আইনের লঙ্ঘন হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগের অভাব, সচেতনতার অভাব, আইন প্রয়োগের জটিলতা ও সর্বোপরি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের অভাবে কপিরাইট আইনটির যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় কপিরাইটের বৈধ স্বত্বাধিকারীর অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে তিনি জানান।
কবি নুরুল হুদা আইনের বিধান অনুযায়ী বিভিন্ন শাখার স্বত্বাধিকারীদের অধিকার আদায়ের জন্য নিজ নিজ ক্ষেত্রে কপিরাইট সোসাইটি গঠন, নতুন আইন প্রণয়নে খসড়া তৈরি ও এ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির পরামর্শ দেন। কপিরাইট আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল ও দায়ী ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে তিনি পৃথক ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রপার্টি কোর্ট বা আইপি আদালত গঠনের প্রস্তাব করেন।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর সচিব মো. মনজুরুর রহমান বাসসকে জানান, কপিরাইট আইনের আওতায় একটি এন্টি পাইরেসি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। কোথাও কোন স্বত্বাধিকারীর অধিকার ক্ষুণ্ন্ন হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ ও আইন লংঘনকারীর শাস্তি নিশ্চিত করাই এই টাস্কফোর্সের কাজ। তিনি এন্টি পাইরেসি টাস্কফোর্সকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে মেধাস্বত্ব সুরক্ষার পরামর্শ দেন। সৃজনশীল ক্ষেত্রে পেশাজীবীদের সমন্বয়ে কপিরাইট ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ গ্রহণের জন্যও তিনি আহ্বান জানান। মনজুরুর রহমান সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কপিরাইট অফিসে একজন কপিরাইট বিশেষজ্ঞকে নিয়মিত হিসাবে নিয়োগ দেয়ার সুপারিশ করেন।
