আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছেলে-মেয়ে আলাদা স্কুলে পড়ে, আলাদা নিয়মনীতিতে বড় হয়, আলাদা জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়। এরপর যখন বিশ্ববিদ্যালয় অথবা ক্যারিয়ার লাইফে তাদের এক হয়ে কাজ করতে হয় তখন তাদের ভাবনা চিন্তার মাঝে কিছু পার্থক্য লক্ষ করা যায়। এই পার্থক্য তাদের এক হতে বাধা দেয়, বাধা দেয় তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও। বলা হয়, ‘ছেলে-মেয়ের মাঝে বেশি মেলামিশা ঠিক না।’ দুইটা শিশুকে শিশু হিসেবে না দেখে ছেলে বাচ্চা মেয়ে বাচ্চা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা তাদের মাঝে সৃষ্টি করে বৈষম্য। এই বৈষম্যই পরবর্তীতে তৈরি করে আড়ষ্টতা, জড়তা। ব্যস, চিরদিন ধরে দেখা মেয়েটা ছেলেটার কাছে হয়ে উঠে রহস্যময়ী, অন্য রকম আকাঙ্ক্ষার। আর ছেলেটা মেয়েটার কাছে হয়ে উঠে বাইরের মানুষ, পরপুরুষ। কো-এডুকেশনে পড়া ছেলে-মেয়ের মাঝে এই সমস্যা কম দেখা যায়।
তারা সাধারণত অনেক স্বতঃস্ফূর্ত হয়। তারা ছেলে-মেয়ের বাধা ডিঙ্গিয়ে আগে নিজেদের মানুষ ভাবার সুযোগ পায়। পরে ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে তাদের মাঝে আর কোনো জড়তা কাজ করে না। একসাথে পড়াশোনা, ঘোরাঘুরি আর হাসি-আনন্দ চলে সমানতালে। কিন্তু এত কিছুর মাঝেও চলে একটা নির্দিষ্ট অথচ অদৃশ্য এগিয়ে থাকার প্রতিযোগিতা। অবশ্য এগিয়ে থাকার দৌড়ে মেয়েদের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। ছোটবেলা থেকে হয়তো একটা কথা শুনে এসেছেন মেয়েরা নাকি অংকে ভালো হয় না। আর একটু বড় হয়ে হয়তো শুনেছেন ইঞ্জিনিয়ারিং নাকি মেয়েদের জন্য না। কিন্তু গত কয়েক বছর থেকেই মেয়েদের অগ্রগতি নজরে পড়েছে। পরীক্ষার হিসেবে নিকেশেও ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের ফলাফল এখন অনেক ভালো।
মোট পাসের নিরঙ্কুশ সংখ্যা হিসাব করলে সামান্য ব্যবধানে হলেও সারা দেশে মোটের ওপর মেয়েরাই এগিয়ে। কিন্তু শুধু শুকনো অঙ্কের হিসাবে মেয়েদের এই সাফল্য বিবেচনা করলে ভুল হবে। বাংলাদেশে মেয়েদের কী রকম দৈনন্দিন বৈষম্যের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, সে কথা আমাদের অজানা নয়। এত বাধা সত্ত্বেও মেয়েরাই লেখাপড়ায় এগিয়ে, এমন কথা পড়ার পর তাদের নামে ‘থ্রি চিয়ার্স’ না বলে উপায় নেই। একটি গবেষণাতে দেখা গেছে শিক্ষাজীবনের শুরুতে মেয়েদের আইকিউ ছেলেদের থেকে বেশি। ৭ বছর বয়সী মেয়েদের আইকিউ ১০১ যেখানে সমবয়সী ছেলের আইকিউ ৯৯ দশমিক ৫। ধীরে ধীরে মেয়েরা যখন বড় হতে শুরু করে তাদের মধ্যে ভয় বা নিজের উপর অবিশ্বাস বাড়তে থাকে। কারণ আমাদের সমাজে ব্যবস্থায় মেয়েদেরকে উঠতি বয়সেই হাজার ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া শুরু হয়।
হঠাত্ করেই আসা এসব নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা তার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করে যার কারণে মেয়েরা নিজের উপর আত্মবিশ্বাস হারাতে শুরু করে। মেয়েদের মনে বারবার দ্বিধা আসতে থাকে—‘আমি মনে হয় পারব না’। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ষষ্ঠ শ্রেণীতে থাকা মেয়ের আত্মবিশ্বাস ৭২% আর দশম শ্রেণী পর্যন্ত যেতে যেতে সে আত্মবিশ্বাস ৫৫% এসে ঠেকে। আর এই আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির কারণে তারা পড়ালেখাতে সেভাবে মনোযোগী হতে পারে না। যেকোনো কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করার সাহস হারাতে থাকে।
কিন্তু যেসব মেয়েদের উপর এ রকম অবিশ্বাসী মনোভাব প্রভাব ফেলতে পারে না তারা ঠিকই তাদের লেখাপড়াতে ভালো ফল করতে থাকে।
লেখাপড়ায় মেয়েরা যে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। তাদের এগোনোরই কথা, কারণ শারীরিকভাবে ছেলেদের তুলনায় তাদের একাধিক সুবিধা রয়েছে। সবচেয়ে বড় সুবিধা, তাদের উন্নত মস্তিষ্ক। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ‘করপাস কালোসাম’ অর্থাত্ সেসব টিস্যু, যা মস্তিষ্কের দুই ভাগকে জোড়া লাগায়—পরিমাণে প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেশি। এর ফলে মাথার দুই ভাগের মধ্যে আদান-প্রদানের ব্যাপারে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা অধিক চটপটে। মস্তিষ্কের কোষের গঠনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে মেয়েদের স্মৃতিশক্তিও বেশি। স্মৃতি জমিয়ে রাখার জন্য যে ‘নিউরাল কানেকটর’ ও ‘হিপোক্যাম্পাস’ চাই, ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের তা বড়। এর ফলে তাদের স্মৃতিশক্তিই বেশি নয়, জটিল বিষয় বিশ্লেষণের ক্ষমতাও বেশি। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের মস্তিষ্ক-অগ্রভাগের করটেক্স (প্রি-ফ্রন্টাল করটেক্স) অধিক কর্মক্ষম এবং অধিকতর কম বয়সে পরিণত আকার ধারণ করে।
ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের যে অধিক বিবেচক ও পরিণত বলে ভাবা হয়, তার কারণ মস্তিষ্কের এই গঠনগত বৈশিষ্ট্য। একই কারণে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা অনেক কম আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।
তাদের মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলের পরিমাণ বেশি হওয়ায় ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ‘মাল্টিটাস্ক’ বা একই সঙ্গে একাধিক কাজ করার ক্ষমতা বেশি রাখে।
সোজা কথায়, প্রকৃতিই মেয়েদের এমনভাগে গঠন করেছে যে তাদেরই এগিয়ে যাওয়ার কথা।
মেয়েদের যদি শুধু হেঁশেলে আটকে না রেখে বাইরে বেরিয়ে আসতে দেওয়া হয়, তাহলে পৃথিবীর চেহারাটাই বদলে যেতে পারে।
মডেল
বাপ্পী, সাইমন
বর্ণা ও শানাই
