খুলনায় দুইশ জরাজীর্ণ ভবনে হাজারো মানুষের বসবাস

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৪৩
খুলনা মহানগরীসহ জেলায় শতাব্দী প্রাচীন দুই শতাধিক জরাজীর্ণ ভবনে বছরের পর বছর ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করছে। এর মধ্যে মহানগরীর বৃহত্ বাণিজ্যিক কেন্দ্র বড় বাজারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। বাসা-বাড়িসহ এসব ভবন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসাবেও ব্যবহূত হচ্ছে। এ ভবনগুলো ধসে গিয়ে যে কোন মুহূর্তে সাভার ট্রাজেডির মত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করছে অনেকে। প্রতিবছরই মালিকদের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিজ নিজ খরচে ভেঙ্গে ফেলার নোটিস দেয় খুলনা সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু সেসব নোটিসে আজ পর্যন্ত কেউ পাত্তা দেয়নি। এরই মধ্যে এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধসে কয়েকবার হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তারপরও ভবনের বাসিন্দাদের সেখান থেকে সরানো যাচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৪ সালের ১০ জুন খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে ভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। কেসিসি’র তত্কালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান প্রকৌশলী, উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও এস্টেট অফিসারের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি নগরীতে মোট ৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে। এসব ভবনের অধিকাংশই নগরীর বড় বাজার ও বাজারের আশপাশ এলাকায় অবস্থিত। ২০০৪ সালের ২০ জুন উক্ত কমিটি ভবন মালিকদের তিন সপ্তাহের সময় বেঁধে দিয়ে ভবনগুলো ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেন। ২০০৬ সালে মাত্র দুটি ভবন ভাঙ্গা হলেও বাকি ভবনগুলো আর ভাঙ্গা হয়নি। এদিকে ২০০৪ সালের প্রথম দিকে গণপূর্ত বিভাগ নগরীতে আরো ১৫টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে। তত্কালীন বিভাগীয় কমিশনারকে চেয়ারম্যান ও গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে সদস্য সচিব করে পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ড নামে ৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সদস্যরা ঝূঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করার মাধ্যমে তা বিক্রি করার জন্য সুপারিশ করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বরাবর চিঠি দেয়। কিন্তু দীর্ঘ নয় বছরেও তা কার্যকর হয়নি। সর্বশেষ বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী ২০০৮ সালে কেসিসি’র পরিচালিত জরিপে নগরীর ৪৪টি ভবনকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) আরও ১০৭টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করে তালিকাভুক্ত করে। এই ১০৭টি ভবনের মধ্যে কেসিসি চিহ্নিত ৪৪টি ভবনের সঙ্গে আরও ৫০টি ভবন যোগ হয়ে কেসিসি এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৪ তে। এছাড়া কেডিএ’র আওতাভুক্ত এলাকা যশোরের নওয়াপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় নওয়াপাড়া পৌরসভা ও ফুলতলা উপজেলার দামোদর ইউনিয়নে আরও ৫৭টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা হয়। সব মিলিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা হয় ২০১। সূত্র মতে, ২০০৮ সালে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে খুলনা জেলা প্রশাসন, কেসিসি, দামোদর ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃপক্ষ এবং নওয়াপাড়া পৌরসভা বরাবর চিঠি পাঠানো হয়। সে অনুযায়ী এসব ভবনে ঝুঁকিপূর্ণ ও বসবাসের যোগ্য নয় লিখিত সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এরপর এসব ভবন ভেঙ্গে ফেলার জন্য কয়েক দফা নোটিস দেয়া হয়। তবে তাতে সাড়া দেননি সংশ্লিষ্ট ভবনের মালিক বা ব্যবহারকারীরা। দেখা গেছে, নগরীর বড়বাজার এলাকায় জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি ভবনের অধিকাংশ দোতলা বা তিনতলা। এসব ভবনের উপরের অংশে লোকজন বসবাস করছেন এবং নিচতলায় দোকানপাট ও কাঁচামালের আড়ত। ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভবনে বসবাসকারী মানুষ ও বাজারে আসা লোকজনের জীবন হুমকির মুখে রয়েছে। এ বাজারে ২০০৮ সালে একটি ভবন ধসে একজন নিহত ও কয়েকজন আহত হন। নগরীর জেলা কারাগারের পুরোনো ভবন, টুটপাড়া আনসার ক্যাম্পের ভেতরে ভূতের বাড়ি ও খুলনা জেনারেল হাসপাতালের সামনে একটি তিনতলা ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া খুলনা প্রেসক্লাবের অদূরে স্যার ইকবাল রোডে, বসুপাড়া, হাজি মুহসিন রোড, গগনবাবু রোড, মুন্সিপাড়া, রায়পাড়া, দোলখোলা, বানিয়াখামার, টুটপাড়া, মুজগুন্নি, খালিশপুর, দৌলতপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। জরাজীর্ণ এসব ভবনের দেয়ালে পাকুড় ও বটগাছসহ বিভিন্ন ধরনের আগাছা জন্মেছে। অনেক আগেই এসব ভবনের পলেস্তারা খসে পড়ে দেয়ালগুলোয় ফাটল দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির সময় এসব ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। এ ব্যাপারে কেসিসি’র এস্টেট অফিসার মো. নুরুজ্জামান তালুকদার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মালিকদের বার বার নোটিস দিলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তারপরও সম্ভাব্য দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি এড়াতে সিটি করপোরেশন আন্তরিক। তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হবে।