অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের উপর কালো ছায়া

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৪৯
দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যত্ কোন দিকে যাচ্ছে- এ প্রশ্ন এখন সবমহলেই ঘুরপাক খাচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অচলাবস্থার মধ্যেই দেশের প্রধান রফতানি আয়ের খাত গার্মেন্টস শিল্পে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। সাভার ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্র করে যেভাবে ভাঙচুর আর গার্মেন্টস শিল্পে ধর্মঘট কিংবা উত্পাদন বন্ধের ব্যবস্থা করা হয়েছে তাতে ভবিষ্যত্ নিয়ে শংকায় দিন কাটাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। শুধু গার্মেন্টসই নয়, সৃষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যান্য শিল্পকারখানাও বন্ধ করে দিতে বাধ্য করা হয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের নামে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরির মাধ্যমে অর্থনীতিকে দাবিয়ে রাখতেই যেন তত্পর হয়ে উঠছে কোন কোন সংঘবদ্ধ গ্রুপ। ভাঙচুর করা হয়েছে ব্যাংকের এটিএম বুথ, রাস্তাঘাটে গাড়ি, খাবারের দোকানসহ অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও। গার্মেন্টস শিল্পের বাইরের এসব শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে বিশেষজ্ঞ মহলকে। এটি কি কারো ষড়যন্ত্র? দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করার জন্য নেপথ্যে কারো ইন্ধন কি না সেটিও এখন বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের মতে, মালিকরা শুধু গার্মেন্টস ও হোসিয়ারি কারখানা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। কোন কোন শ্রমিক সংগঠনও গার্মেন্টস ধর্মঘট কর্মসূচি পালনের কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবে গতকাল সাভার-আশুলিয়াসহ ঢাকার আশপাশের আরো কিছু এলাকার কোন শিল্প কারখানাই চালু করতে দেয়া হয়নি। এই ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে তলানিতে নিয়ে ঠেকানোই কি কারো নীলনকশার বাস্তবায়ন করা হচ্ছে? একটি ভবন ধস ও সেখানে ৫টি গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের হতাহতের ঘটনার পর ওয়াশিংটন পোস্ট শিরোনাম দিয়ে বলেছে, ‘ভবন ধসের পর বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যত্ অন্ধকারে’। উদ্যোক্তাদের অনেকেই এই শিরোনামের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেছেন, গত কয়েকদিনে যা তান্ডব ঘটানো হয়েছে তাতে অর্থনীতির ভবিষ্যত্ নিয়ে উদ্বেগ থাকাই স্বাভাবিক। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে চলতি বছরে প্রবৃদ্ধি অর্জনের হার কমে যাওয়ার ইঙ্গিতও দেয়া হয়েছে। উদ্যোক্তারা বলেন, শিল্পের চাকা না ঘুরলে প্রবৃদ্ধির চাকাও ঘুরবে না। উপরন্তু, শিল্প রুগ্ন হতে বাধ্য হবে। একজন উদ্যোক্তাকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে শিল্প চালু করতে হয়। বর্তমানে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধও সম্ভব হবে না। তাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়ে যাবে। গত একবছরের তথ্যে দেখা যায়, খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। এর কারণ ছিল গ্যাস-বিদ্যুত্সহ জ্বালানি সংকট। দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি সংকটে থাকা শিল্পকারখানাগুলো মোকাবেলা করছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এরইমধ্যে ভবন ধসের ঘটনা এবং চলতি অস্থিরতা। বিজিএমইএর একটি সূত্র জানায়, দেশে গার্মেন্টস শিল্প এখন অর্ডার বাস্তবায়ন নিয়েই ব্যস্ত। কিন্তু সাভার ট্র্যাজেডির কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি রফতানি আদেশ বাতিলের জন্য যথেষ্ট। সঠিক সময়ে উত্পাদন না হলে সময়মত জাহাজিকরণও সম্ভব হবে না। তাতে বাংলাদেশের ইমেজ ক্ষুণ্ন হবে এবং রফতানি আয় কমে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। সূত্র মতে, কোন কোন মহল বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বাজার নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এর আগেও কয়েকটি গার্মেন্টস কারখানায় দুর্ঘটনা কিংবা শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছিল। পরবর্তীতে এই ধরনের গার্মেন্টস কারখানা কাদের হাতে চলে গেছে- সেটি খোঁজ নিলেই স্পষ্ট হবে যে, মহলবিশেষ বাংলাদেশে গার্মেন্টসের প্রসার চাচ্ছে না। প্রধান রফতানি আয়ের এই খাতের যদি এমন দশা হয়, তবে অর্থনীতিতে এর অভিঘাত কতোটা হবে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ভবিষ্যত্ নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টে ‘ভবন ধসে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যত্ অন্ধকারে’ এই শিরোনামে এক নিবন্ধ ছাপা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, রানা প্লাজা ধসে পড়ার আগেই বাংলাদেশের ১৯০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক শিল্প চাপের মুখে পড়ে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপি-জামায়াতের ৩৩ দিনের হরতাল, বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক সহিংসতায় বাংলাদেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। পশ্চিমা দেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা ব্র্যান্ডের পোশাক সরবরাহকারী কারখানাগুলো উত্পাদন স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছিল। তবে সড়ক ও সমুদ্রবন্দরসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ায় এবং শুল্ক অফিসসহ সরকারি দপ্তর বন্ধ থাকায় কাঁচামাল আমদানি ও সঠিক সময়ে পণ্যের জাহাজিকরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলো, জানুয়ারি থেকে অস্থিরতার কারণে তারা ৩শ’ কোটি মার্কিন ডলারের অর্ডার (কার্যাদেশ) হারিয়েছে এবং বিদ্যমান ৫০ কোটি ডলারের অর্ডার প্রতিবেশী ভারতে চলে যাচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতের অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, আগামীতে রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা এবং রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ঘটনায় ওয়াল-মার্টের মতো ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেবে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যবস্থাপনা ও মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি এসব বিপর্যয়ের আগে রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে এই শিল্প ব্যাহত হচ্ছে। এই সহিংসতা সহসাই কমবে বলেও মনে হচ্ছে না। ওয়াশিংটন পোস্টে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, সামপ্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতায় শতাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সমপ্রতি ঘটে যাওয়া যে কোন দুর্ঘটনার চেয়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় শিল্প খাত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী এবং গোড়া ইসলামীপন্থী এ দুদলে ভাগ হয়ে পড়েছে। বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের ট্রাইব্যুনালে বিচার করছে। অন্যদিকে নতুন ইসলামী সংগঠন হেফাজত-ই-ইসলাম আন্দোলন করছে। তারা ঢাকায় লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশ করে বাধ্যতামূলক ধর্মীয় শিক্ষা ও নারী পুরুষের অবাধ মেলা মেশা বন্ধ করতে সরকারের প্রতি দাবি জানাচ্ছে। এবিষয়ে অনেকেই বাংলাদেশকে ‘তালেবানকরণ’ করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের কারখানা থেকে পোশাক আমদানি করায় পোশাক শিল্পে ব্র্যান্ড জো ফ্রেশকে বয়কট করার আহ্বান জানিয়েছেন কানাডার কিছু গ্রাহক।