গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের চেষ্টার পরিণতি কখনো ভাল হয়নি

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৩, ২৩:০২
বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের চেষ্টা বা ভিন্নমত দলনের নীতি কোনো সরকারের জন্যই ভাল পরিণতি বয়ে আনে না। অতীতে এ ধরনের দৃষ্টান্ত অনেক রয়েছে। আগেও বিভিন্ন সময় দেখা গেছে যে, সরকার ভিন্নমত বা গণমাধ্যমের সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। বর্তমান সরকারও একই পথে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতারের পর নিন্দনীয় কৌশল খাটিয়ে আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দিয়েছে; কিন্তু এসব করে কখনো লাভ হয় না। সরকারের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের খবর জনগণ এমনিতেই জেনে যায়। গতকাল শনিবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। ‘মাহমুদুর রহমানের রিমান্ড ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা’ শীর্ষক আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ফরহাদ মজহার। অন্যান্যের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন একাংশের সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, নিউনেশন পত্রিকার সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম, বিএফইউজের সিনিয়র সহকারি মহাসচিব এম আবদুল্লাহ, প্রকৌশলী নেতা রিয়াজুল ইসলাম রিজু প্রমুখ। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, স্বাধীনতা-পূর্ব এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে কোনো সরকারই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল না। সব সরকারই গণমাধ্যমের টুটি চেপে ধরে পার পেতে চেয়েছিল; কিন্তু তাতে ভাল ফল হয়নি। সুতরাং ভাল চাইলে গণমাধ্যমকে তার নিজের গতিতেই চলতে দেয়া উচিত। সরকারকে সহিষ্ণুতার নীতি গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশের মানুষ এখন যথেষ্ট সজাগ। খামোখা গণমাধ্যমকে দমনের চেষ্টা করবেন না। সাভারে ভবন ধসের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীরের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে রফিক-উল হক বলেন, ফালতু ও হাস্যকর কথা না বলে মন্ত্রীদের উচিত নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্বটা সঠিকভাবে পালন করে যাওয়া; কিন্তু তারা সেটা না করে কেবল উল্টা-পাল্টা কথাই বলে যাচ্ছেন। পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে এই বর্ষীয়ান আইনজীবী বলেন, প্রধানমন্ত্রী চাচ্ছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অন্যদিকে খালেদা জিয়া চান নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আমি মনে করি, এই দুইটির মাঝামাঝি কিছু করে একটি সমাধানে পৌঁছানো যেতে পারে। মূল কথা হলো- অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর নির্যাতন দেখে আজ যারা বিশেষ আনন্দিত, তাদের কপালেও একদিন রিমান্ড ও জেল রয়েছে। কারণ সময় ও সুর বদলাতে সময় লাগে না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে দেশে মানুষেরই স্বাধীনতা নেই, সে দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দিয়ে কি হবে? ফরহাদ মজহার বলেন, মাহমুদুর রহমান বর্তমান সরকারের দুর্নীতি, লুটপাট এবং নিপীড়নের কথা তার পত্রিকায় তুলে ধরছিলেন। তিনি বার বার বলছিলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। আর মাহমুদুর রহমান বরাবরই ওয়ান ইলেভেনের কুশিলবদের বিরোধিতা করছিলেন। এই তিনটি কারণে সরকার মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে। রুহুল আমিন গাজী বলেন, বেআইনিভাবে প্রেস সিলগালা করে যদি পত্রিকা বন্ধ করা যায় তাহলে পর্যায়ক্রমে দেশের সব পত্রিকাই বন্ধ হয়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা কেউই নিরাপদ নই। তাই ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদেরকে এ অবস্থা মোকাবিলা করতে হবে। শতকত মাহমুদ বলেন, সরকার খুবই নোংরা রাজনৈতিক কারণে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে। এই রাজনীতির অবসান ঘটাতে চাইলে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটাতে হবে। ড. আসিফ নজরুল বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৩ দিনের বেশি কোনো ব্যক্তিকে রিমান্ডে নেয়া যাবে না। অথচ মাহমুদুর রহমানকে ১৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় জোচ্চুরির মাধ্যমে আমার দেশ বন্ধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের সকল গণমাধ্যম সরকারের পক্ষে কাজ করছে। শুধু আমার দেশ সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলছে। মূল প্রবন্ধে সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ মামলায় বিচারপতি মো. হামিদুল হক ও বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল কাউকে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপারে ১০ দফা নির্দেশনা প্রদান করে। হাইকোর্টের এ নির্দেশনার বিরুদ্ধে সরকার আপিল করলে আপিল বিভাগ তা খারিজ করে দেয়; কিন্তু মাহমুদুর রহমানের রিমান্ডের ক্ষেত্রে এ আদেশের তোয়াক্কাই করা হয়নি।