ক্রিয়েটিভ এক কোরিওগ্রাফার

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:৩৫
গত বছর লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল অলিম্পিকের বিশাল আসর। অলিম্পিকের এই আসরে সারা বিশ্বের নজর ছিল লন্ডনের এই অনুষ্ঠানে। সে সময় অলিম্পিক আসর নাচিয়েছিলেন যারা, তাদের অন্যতম ছিলেন একজন কোরিওগ্রাফার। অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যে নাচ পরিবেশন করা হয়েছিল তাতে কোরিওগ্রাফার হিসেবে ছিলেন আকরাম খান। তার কথা লিখেছেন প্রাঞ্জল সেলিম আকরাম খান, এক বাঙালি যুবক। অনন্য সৃজনশীলতা দিয়ে বিশ্ব মাতিয়েছেন তিনি। নাচের সঙ্গে সখ্যতার শুরু তার সাত বছর বয়সেই। এ বিষয়ে মায়ের উত্সাহই ছিল বেশি। বোনের সঙ্গে পাঠিয়ে দিতেন কত্থক নাচের ক্লাসে। কত্থক দিয়েই আকরামের নাচে হাতেখড়ি। তবে তিনি গুরু মানতেন পপ-রকস্টার মাইকেল জ্যাকসনকে। তার জন্ম ২৯ জুলাই ১৯৭৪ সালে সাউথইস্ট লন্ডনের উইম্বলডনে। মা-বাবা দুজনই বাংলাদেশি। আকরামের জন্মের বছরই তার পরিবার ব্রিটেনে যায় বাংলাদেশ থেকে। ব্রিটেনে অনেক বাঙালির মতো আকরাম খানের বাবারও একটি রেস্তোরাঁ ছিল। তবে সেখানে কাজ করতে ভালো লাগত না তার। নাচকেই সম্বল করে নিলেন। লেখাপড়া করেছেন ধ্রুপদী, কত্থক ও সমকালীন নৃত্যের ওপর। তার প্রথম ওস্তাদ ছিলেন শ্রী প্রতাপ পাওয়ার। ১৪ বছর বয়সে প্রথম মঞ্চে ওঠেন আকরাম। সে সময় তিনি পিটার ব্রুকের শেক্সপিয়ার একাডেমীর ‘মহাভারত’-এ অংশ নেন। দলের হয়ে ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ সময়কালে পৃথিবীর অনেক দেশ ভ্রমণ করেন। টিভিতে প্রথম নাচার সুযোগ পান ১৯৮৮ সালে। পরে ডি মন্টফোর্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমকালীন নৃত্য এবং নর্দান স্কুল অব কনটেমপরারি ড্যান্স থেকে পারফর্মিং আর্টসের ওপর শিক্ষা শেষ করেন। এরপর তিনি আনা তেরেসা ডি ক্রিসমেকারসের ব্রাসেলস বেস এক্স দলে কাজ করেন। দলের হয়েই প্রথম একক নৃত্যানুষ্ঠান করেন ১৯৯০ সালে। ১৯৯৯ সালে জেরউড ফাউন্ডেশন আকরাম খানকে সেরা কোরিওগ্রাফার অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। ২০০০ সালের আগস্ট মাসে গড়ে তোলেন আকরাম খান কোম্পানি। দলের প্রথম কাজ ‘কাশ’। অনিশ কাপুর এখানে সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ২০০২ সালে ইডেনবার্গ উত্সবে কাশের প্রদর্শনী হয়। আকরাম খান নাচের নতুন ভাষা উদ্ভাবনে বেশি আগ্রহী। সাউথ ব্যাংক পণ্ডিত বিরজু মহারাজ ও শ্রী প্রতাপ পাওয়ারের সঙ্গে ‘এ গড অব স্মল টেলস’-এ কাজ করেন। আবৃত্তির সঙ্গে নেচে অনেক নামও করেন তিনি। ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি সাউথ ব্যাংক সেন্টারের সহযোগী শিল্পী ছিলেন। সে বছরই রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাকে এমবিই খেতাব প্রদান করেন। ২০০৮ সালে তিনি লন্ডনের ন্যাশনাল থিয়েটারে নৃত্যনাট্য উপস্থাপন করেন ফরাসি অভিনেত্রী জুলিয়েট বিনোশের সঙ্গে। এ ছাড়া কাজ করেছেন কাইলি মিনোগ, ফরাসি ব্যালে শিল্পী সিলভি গুইলেমের সঙ্গে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪০ বছর উপলক্ষে তিনি পরিবেশন করেছেন একক নৃত্যনাট্য ‘দেশ’। এ কাজটি তাকে এনে দিয়েছে অলিভিয়ের অ্যাওয়ার্ড। এর জন্য অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন ‘ক্রাউচিং টাইগার হিডেন ড্রাগন’ চলচ্চিত্রের ভিজ্যুয়াল ডিজাইনার টিম ইয়েপের কাছ থেকে। একবার হংকংয়ে এক অনুষ্ঠানে সেট ডিজাইনার টিম ইয়েপের সঙ্গে নাচ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন আকরাম খান। টিমই বলেন, ‘কেন তুমি তোমার নিজের অরিজিন নিয়ে একটি নৃত্যনাট্যের পরিকল্পনা করছ না।’ টিম ইয়েপের কাছ থেকে নিজের দেশকে নিয়ে কাজ করার পরামর্শ পেয়ে আকরাম বাংলাদেশে আসেন ২০১০ সালে। ঘুরেফিরে দেখেন বাংলাদেশ, মানুষের আচার-আচরণ খেয়াল করে দেখেন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বোঝার চেষ্টা করেন। ব্রিটেনে ফিরে সেসব উপাদান নিয়ে তিনি লিখতে শুরু করেন নৃত্যনাট্য ‘দেশ’। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটেনের লেস্টারে এবং অক্টোবরে লন্ডনের শেডলার ওয়েলস থিয়েটারে দেশ প্রদর্শনের পর তোলপাড় শুরু হয় ব্রিটেনসহ সারা বিশ্বে। নাচ ও কোরিওগ্রাফি সম্পর্কে জানাতে চাওয়া হলে আকরাম বললেন, ‘আমার পড়াশোনায় মন ছিল না একদমই। ছোটবেলায় খুব দুরন্ত ছিলাম। এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসতে পারতাম না। স্কুলের শিক্ষকরা মায়ের কাছে রোজই আমার নামে নালিশ জানাতেন। কখনও কখনও ইচ্ছে করেই ফেল করতাম। পড়তে আমার একদমই ভালো লাগত না।’ আর তাই নাচকেই বেছে নিয়েছেন জীবিকা হিসেবেও। তবে কাজটা এত সহজ ছিল না। সেই অভিজ্ঞতার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘নাচ শিখতাম বলে সমবয়সী ছেলেরা আমার সঙ্গে কথা বলত না। এড়িয়ে চলত। মেয়েরা মাঝেমধ্যে কথা বলত, তবে দয়া করে। স্কুলে একটি ডিস্কো প্রতিযোগিতায় জেতার পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। তখনই বুঝলাম মাইকেল জ্যাকসনের মতো চালচলন করতে পারলেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাব। লোকে ‘কুল’ বলবে।’ গত বছর ২৭ জুলাইয়ের অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করেন বিশ্বনন্দিত ১২ হাজার কলাকুশলী। ছোট ডান্স পিসের পরিবর্তে একটিই বড় উপস্থাপনা করবেন তিনি। তার সেই উপস্থাপনার মাধ্যমেই ফুটিয়ে তুলবেন নিজের বক্তব্য। এবারের অলিম্পিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানের থিম ছিল শেক্সপিয়রের টেম্পেস্ট। ইংল্যান্ডের জাতীয় স্বাস্থ্য পরিসেবাকে সম্মান জানাতেই বেছে নেওয়া হয়েছিল এ বিশেষ থিমটি। কোরিওগ্রাফার আকরাম খান ব্রিটেনে এখন বেশ জনপ্রিয়। ইতোমধ্যেই কাজ করেছেন ফরাসি অভিনেত্রী জুলিয়েট বিনোশে, ফরাসি ব্যালে নৃত্যশিল্পী সিলভি গুইলেম এবং ভারতীয় সুরকার নিতিন সওহনের সঙ্গে। তবে শুধু বিদেশি ঘরানারই নয়। দেশের জন্যও আকরামের অনেক ভালোবাসা রয়েছে।