ব্রিটেনের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:৩৯
লৌহ মানবী সারা বিশ্ব তাকে লৌহ মানবী নামেই জানে। গত ৮ এপ্রিল চিরতরে ঘুমিয়ে পড়েন ইংল্যান্ডের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী লৌহ মানবী খ্যাত মার্গারেট থ্যাচার। তার জন্ম ১৯২৫ সালের ১৩ অক্টোবর, ইংল্যান্ডের লিঙ্কনশায়ার শহরের গ্র্যান্থামে। তখন তার পুরো নাম মার্গারেট হিলডা রবার্টস। ১৯৫১ সালে ডেনিস থ্যাচারকে বিয়ে করার পর নাম হয় মার্গারেট থ্যাচার। সংক্ষিপ্ত জীবনী মার্গারেটের বাবা আলফ্রেড রবার্টস ছিলেন নর্দাম্পটনশায়ারের বাসিন্দা। লিঙ্কনশায়ারে তার মুদির ব্যাবসা ছিল। পরিবার থেকেই রাজনীতির দিক্ষা পেয়েছিলেন মার্গারেট থ্যাচার। মার্গারেট থ্যাচারের বাবা গ্র্যান্থামের মেয়র ছিলেন। মার্গারেটের প্রথম স্কুল ছিল হান্টিংটন রোড প্রাইমারি স্কুল। পরে স্কলারশিপ পেয়ে তিনি চলে যান কেস্টিভেন এন্ড গ্র্যান্থাম গার্লস স্কুলে। তখন মার্গারেট যে শুধু পড়াশোনাতেই ভালো ছিলেন তা নয়। তিনি পিয়ানো বাজাতেন, হকি খেলতেন, কবিতা আবৃত্তি করতেন, সাঁতার কাটতেন। পড়াশুনা চলাকালীন সময়েই তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়। ১৯৪৬ সালে তিনি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি কনজারভেটিভ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫১ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি ব্যবসায়ী ডেনিস থ্যাচারকে বিয়ে করেন। পরে তিনি আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি ব্যারিস্টারি পাস করেন। একই বছরে তার যমজ সন্তানও হয়। তাদের নাম রাখা হয়- ক্যারল এবং মার্ক। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থ্যাচার ১৯৫৯ সালে উত্তর লন্ডন থেকে কনজারভেটিভ দলের এমপি নির্বাচিত হন। পরে তিনি ‘কনজারভেটিভ পার্টি’র নেতা নির্বাচিত হন। তবে তিনি বিখ্যাত হন অন্য কারণে। তিনিই ব্রিটেনের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭৫ সালে রক্ষণশীল দলের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যাডওয়ার্ড হিথকে হারিয়ে দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন মার্গারেট থ্যাচার। এরপর তিনি গড়লেন ইতিহাস, নির্বাচিত হলেন ব্রিটেনের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। ব্রিটেনের ইতিহাসে সর্বাধিক সময় ধরে প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত, পরপর তিনবার ভোটে বিজয়ী হয়ে তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। মার্গারেট একই সাথে সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং ব্যাপক সমালোচিত হন তার বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে। মূলত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারিকরণের জন্য তিনি সাধারণ মানুষের বিরাগভাজন হন। উল্লেখযোগ্য অবদান মার্গারেট থ্যাচার প্রধানমন্ত্রী হয়েই দেশের উন্নয়নে বেশ জোরেশোরে কাজ শুরু করেন। তবে তার সব সিদ্ধান্তই যে খুব জনপ্রিয় ছিল তা নয়। কিছু কিছু সিদ্ধান্ত বেশ সমালোচিতও হয়। তবে তার অর্জনের পরিমাণ এই কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের তুলনায় অনেক বেশি। তার যে বৈশিষ্ট্য সবার নজরে পড়েছিল তা হলো সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি থাকতেন একদম অটল-অবিচল। মার্গারেট থ্যাচার সবচেয়ে বেশি দৃঢ়তার পরিচয় দেন ফকল্যান্ড যুদ্ধে। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ব্রিটিশ শাসনাধীনে থাকা ফকল্যান্ডে দ্বীপে হামলা চালায়। বহুদিন ধরেই ব্রিটেন আর আর্জেন্টিনার মধ্যে দ্বীপটা নিয়ে সংঘর্ষ চলছিল। তারই ফল ছিল এই যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধে, মার্গারেট থ্যাচারের নেতৃত্বে জয়লাভ করে ব্রিটেন। এই যুদ্ধে জয়লাভের পর থেকেই মূলত তিনি ‘আয়রন লেডি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। থ্যাচারের প্রধানমন্ত্রিত্বের শেষটা অবশ্য সুখকর হয়নি। তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ইউরোপের ব্যাপারে তার নীতি নিয়ে তার দল ও মন্ত্রিসভায় অসন্তোষ দেখা দেয়। এ কারণে মার্গারেট থ্যাচারকে পদত্যাগ করতে হয়। ২০০২ সালে হার্ট স্ট্রোকের কারণে প্রথম প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে নিজেকে আড়াল করে নিয়েছিলেন তিনি। এমনকি ২০১০ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন মার্গারেট থ্যাচারের ৮৫তম জন্মোত্সবে উপস্থিত হলেও থ্যাচার সশরীরে উপস্থিত হতে পারেননি। লন্ডনে ২০১১ সালে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং পরম রাজনৈতিক মিত্র প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের ভাস্কর্য উন্মোচন অনুষ্ঠানেও যোগ দিতে পারেননি শারীরিক অসুস্থতার জন্য। ২০১২ সালের ক্রিসমাস থেকেই তিনি নিজের বাড়ি ছেড়ে রিজ হোটেলের একটি স্যুইটে থাকতে শুরু করেছিলেন। সেখানেই ৮ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে তিনি ৮৭ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।