গত ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর এখনো অনেক শ্রমিকের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। খবর আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের।
জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা) : সংসারে একটু সচ্ছলতা আনতে জীবননগর গোয়ালপাড়ার মুসলিমা খাতুন (১৮) ওরফে ছোট বুড়ি গার্মেন্টসে চাকরি নেয়। সাভারের ধসেপড়া রানা প্লাজার ৫ম তলায় একটি গার্মেন্টসে সে শ্রমিকের কাজ করতো। বুধবারের ভবন ধসের ঘটনার পর হতে গত ৫ দিনেও তার কোন খোঁজ না পেয়ে তার পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আত্মীয়-স্বজন ছোট বুড়ির ছবি নিয়ে বৃহস্পতিবারই সাভার গেছে; কিন্তু গতকাল পর্যন্ত তার কোন হদিস মেলেনি।
জানা যায়, জীবননগর গোয়ালপাড়া গ্রামের মৃত খোরশেদ আলীর ৩ ছেলে ও ৫ মেয়ের মধ্যে মুসলিমা খাতুন ওরফে ছোট বুড়ি সবার ছোট। উল্লেখ্য, এ দুর্ঘটনায় এ উপজেলার কাশিপুরের ইয়াদুল ইসলাম নামক অপর এক গার্মেন্টস শ্রমিক নিহত হন। তাকে বৃহস্পতিবার তার গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।
রাজাপুর (ঝালকাঠি): ‘আপনারা আমার বুকের ধনকে ফেরত আই না দেন। জীবিত না পারলে আমার বুকের ধনের লাশটা আমার বুকে ফেরত দেন। আমি শুধু একবার ওর মুখখান দ্যাখতে চাই।’ সাংবাদিকদের কাছে এরকম করেই বিলাপ করছিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে নিখোঁজ ঝালকাঠির রাজাপুরের গালুয়া দুর্গাপুর গ্রামের গার্মেন্টস শ্রমিক জামাল হোসেন ওরফে মিজানের মা মিনারা বেগম। মিজান দুর্গাপুরের হতদরিদ্র আলম ওরফে বজলু হাওলাদারের পুত্র। মিজান ও তার স্ত্রী লাইজু আক্তার গত ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজার ৫ম তলায় ফ্যান্টম গার্মেন্টসের ফিনিসিং কোয়ালিটি সেকশনে কর্মরত অবস্থায় চাপা পড়ে নিখোঁজ হন। ২ ঘন্টা পর উদ্ধার কর্মীরা স্ত্রী লাইজু আক্তারকে (২২) আহত অবস্থায় উদ্ধার করে । স্বামী জামাল হোসেন ওরফে মিজান আটকে যায় । গত ৪ দিনেও মিজানের কোন সন্ধান পাননি তার স্ত্রীসহ পরিবার-পরিজনরা।
মিজানের স্ত্রী লাইজু আক্তার রবিবার বিকালে ফোনে এ প্রতিবেদককে জানান, ‘আমার স্বামী এখনো বেঁচে আছে বলে আমার বিশ্বাস। এমনকি শনিবার রাত একটার দিকে সে আমার ফোন থেকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ফোন করে ‘আমি বেঁচে আছি আমাকে বাঁচাও’ বলে আকুতি জানায়। পরে আর তার সাথে কোন যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।’ মিজানের স্কুল পড়ুয়া ছোট বোন মুনা আক্তার জানান, ‘আমার ভাই ছাড়া আমাদের পরিবারের আয়ের আর কোন পথ নেই। তার টাকা দিয়েই আমাদের সংসার ও আমার লেখাপড়া চলত। তার যদি কিছু হয়ে যায় তবে আমরা পরিবারসুদ্ধ না খেয়ে মারা যাব।’
মাগুরা: সাভারের রানা প্লাজায় ভবন ধসের ঘটনায় মাগুরার নিখোঁজদের বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। পাড়া-প্রতিবেশীরা শোকাতুর পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে পারছেন না। ঘটনার চারদিন পরও রবিবার খোঁজ মেলেনি মাগুরা শহরতলীর দরি মাগুরা গ্রামের আছাদ ও শালিখা উপজেলার উজগ্রামের আশরাফ হোসেনের। তাদের পরিবারের সদস্যরা তাদের খোঁজে সাভারে অবস্থান করছেন। এই দুই বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। তাদের পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে উপস্থিত সকলের চোখে পানি এসে যাচ্ছে। ঘটনার দিন আছাদ ও আশরাফ রানা প্লাজায় কর্মরত ছিলেন। জেলার সর্বত্র এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরে দেখা দিয়েছে শোকের ছায়া। বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাদের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানাচ্ছেন। সংসারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির খোঁজ না পাওয়ায় পরিবার দুটি এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
সাতক্ষীরা : সাভার ট্র্যাজেডির বলি সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার প্রবাজপুর গ্রামের বাদশাহ ফিরেছেন লাশ হয়ে। আর কলারোয়া উপজেলার রামভদ্রপুর গ্রামের সাঈদুর রহমানের খোঁজ এখনও মেলেনি । শনিবার রাতে বাদশাহ’র নিথর দেহ নিয়ে ফিরেছেন সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার প্রবাজপুর গ্রামের বাবা আরশাদ আলী। তার মরদেহ এসে পৌঁছালে মা আছিয়া বেগম, বোন রাজিয়া বেগমের আহাজারিতে সেখানকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। বাদশা (২০) সাভারের রানা প্লাজার পঞ্চম তলার একজন গার্মেন্টস শ্রমিক। দুর্ঘটনার পর থেকে বাদশা নিখোঁজ ছিলেন। বাবা আরশাদ আলী, মামা রফিকুল ইসলামসহ স্বজনরা তাকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন। অধরচন্দ্র স্কুল মাঠ, ঘটনাস্থল রানা প্লাজা, এনাম মেডিক্যাল কোথাও তার সন্ধান না পেয়েই হতাশ হন তারা। এক পর্যায়ে শনিবার সকালে অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গলিত লাশের সারির মধ্যে বাদশার মৃতদেহ দেখে পিতা নিজেও চিনতে পারেননি। পরে তার পকেটে থাকা আইডি কার্ড দেখে তার পরিচয় নিশ্চিত হন বাবা। ততক্ষণে তিনি নির্বাক। পরে স্বজনরা বাদশাকে নিয়ে আসেন সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে। শনিবার গভীর রাতে জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে তাকে।
এদিকে, সাতক্ষীরা কলারোয়ার সাইদুর রহমানের খোঁজ মেলেনি এখনও। সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ঘটনার দিন থেকে সে এখনও নিখোঁজ রয়েছে। তার পারিবারিক সূত্র জানায়, কলারোয়া উপজেলার চন্দনপুর ইউনিয়নের রামভদ্রপুর গ্রামের মাহবুবুর রহমানের ছেলে সাইদুর রহমান (২৫) ও তার স্ত্রী বৃষ্টি (২১) সাভারের রানা প্লাজার ৪র্থ তলায় একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন।
