সাভার পৌর এলাকার ‘মূর্তিমান আতংক’ সোহেল রানা ওরফে রানাকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে তার সন্ত্রাস, দখলবাজি ও নানা অপকর্মের সুদীর্ঘ অধ্যায়ের আপাতত সমাপ্তি ঘটেছে। এতে পৌরবাসীর মাঝে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে রানার কথিত গডফাদারদের নিয়ে তারা শংকিত। তারা বলেছেন, রানার গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে তার ‘অপরাধ সাম্রাজ্য’র আপাতত পতন হয়েছে-এটা ঠিক, কিন্তু তার গডফাদাররা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। অনেকেই রানার এই দোর্দণ্ড প্রতাপের পেছনে একজন চিহ্নিত গডফাদারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। রানার পাশাপাশি এসব গডফাদারদেরও শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সাভার পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও এলাকাবাসীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, রানার দীর্ঘদিনের নিপীড়ন, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার অনেকেই। জীবন রক্ষার্থে তারা এতদিন মুখ খোলেন নি। কিন্তু রানা গ্রেফতার হওয়ার পর তাদের অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন। রানার ‘জিরো থেকে হিরো’ হওয়া ও কোটি কোটি টাকার ধন সম্পদের মালিক হওয়ার নেপথ্য কাহিনী প্রকাশ করতে শুরু করছেন প্রকাশ্যেই।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের তিন নেতাসহ কমপক্ষে এক ডজন নির্যাতিত ব্যক্তি ইত্তেফাককে জানান, ১৯৯৬ সালে এক ছাত্রলীগ নেতার হাত ধরে ক্যাডার হিসাবে স্থানীয় রাজনীতিতে রানার আগমন। এরপর সে শুরু করে দখলবাজি ও জালিয়াতি করে জমি বেচাকেনার বাণিজ্য। পাশাপাশি সাভার এলাকার মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় নিজের হাতে। এ সময় শতাধিক সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলে রানা। এভাবে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দামি গাড়ি ও বাড়ির মালিক বনে যায় সে। পরে ২০০১ সালের দিকে বর্তমান গডফাদারের আনুকূল্য লাভ করে রানা। নতুন এই গডফাদার দীর্ঘদিন বাংলাদেশের বাইরে ছিলেন। ওই বছরই দেশে এসে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে এমপি নির্বাচিত হন। রানা তাকে ‘বাবাজান’ বলে ডাকতেন। ‘বাবাজানে’র সামনে পেছনে মোটরসাইকেল বহর নিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় চলাফেরা করতো রানা বাহিনী। ওই গডফাদার মাঝে মাঝে রানাকে ধরে মাথায় চুমো খেতেন প্রকাশ্যে, হাঁটতেন কাঁধে হাত দিয়ে। অনেকেই এই দৃশ্য দেখেছেন।
জানা গেছে, রানা ও তার ক্যাডার বাহিনীর ভয়ে এলাকার মানুষ সবসময় ভীত-সন্ত্রস্ত থাকত। রানা প্লাজার বেসমেন্ট ছিল এক অর্থে নির্যাতন ক্যাম্প। রানা ও তার গডফাদার যে রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতেন ওই রাস্তায় ওই সময় কেউ হাঁটতে সাহস পেতেন না। স্থানীয় থানা প্রশাসন রানার কথায় চলতো বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বেশ কয়েক বছর আগে শীর্ষ পুলিশ প্রশাসন নিরীহ ব্যবসায়ীদের ধরে এনে নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে উেকাচ আদায়ের অভিযোগে ওই থানার ওসি ও এক এসআইকে অন্যত্র বদলি করে। কিন্তু রানার কথায় তার গডফাদার সেই বদলি পর্যন্ত স্থগিত করেছিলেন।
সাভারের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী রবীন্দ্রনাথ সরকারের ৩২ শতাংশ জায়গা দখলের জন্য তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও নির্যাতন করে রানা। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জমিটির দখল নেয় রানা। কারণ রানার শ্বশুর ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী। পাশেই একইভাবে নিরীহ সালেহা বেগমের ২০ শতাংশ জায়গা রানা মাত্র এক লাখ টাকা দিয়ে দলিল করে নেন। সেই ৫২ শতাংশ জায়গায়ই ধসে পড়া রানা প্লাজা নির্মাণ করা হয়। ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে ১০ তলা করার ঘটনায় সাভার পৌর মেয়র রেফাত উল্লাহ বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট ফাইলটিও পৌরসভা থেকে গায়েব হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। রানার নির্যাতন ও হয়রানির কারণে এখনও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেন নি ব্যবসায়ী রবীন্দ্রনাথ সরকার। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব তথ্য জানান। এসময় তার কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছিল।
সাভার উপজেলা চেয়ারম্যান ও ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ফিরোজ কবীর ইত্তেফাককে বলেন, সাভারে এর আগে গার্মেন্টস দুর্ঘটনায় বহু শ্রমিক হতাহত হয়েছে। কোন প্রতিকার হয়নি। রানা প্লাজার ঘটনায় জড়িতরা যে দলের হোক তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। তিনি ৬ তলা ভবন ১০ তলা করার অনুমোদন প্রদানকারী পৌর মেয়রসহ সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে জানতে পৌর মেয়র রেফাত উল্লাহর মোবাইলে কয়েক দফা ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় কয়েকজন গার্মেন্টস মালিক নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানান, রানা তাদের গার্মেন্টসের ঝুট জোরপূর্বক ট্রাকে ভর্তি করে নিয়ে যেতো। তারা কোন প্রতিবাদ করতে পারতেন না। কারণ রানার পেছনে রয়েছে ক্ষমতাধর গডফাদার। মাঝে মাঝে নানা অনুষ্ঠানের নামে তাকে মোটা অংকের চাঁদা দিতে হতো। মোট কথা রানা ও তার বাহিনীর কাছে গোটা পৌরবাসী জিম্মি ছিল। এছাড়া এলাকায় নতুন কোন বাড়ি নির্মাণ কিংবা বেচাকেনার জন্য রানাকে নির্ধারিত কমিশন দিতে হতো বলে জানিয়েছেন একাধিক বাড়ি ও জমির মালিক।
ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সাবেক এমপি আশরাফউদ্দিন খান ইমু বলেন, ‘রানা ও তার গডফাদারের কারণে এলাকায় দলের জনপ্রিয়তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। তার মত একজন ঘৃণিত লোকের ছবির সঙ্গে যখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেখি তখন বুকটা ফেটে যায়।’ রানা যাদের বলে এতো ‘বলিয়ান’ হয়েছে তাদের শনাক্ত করে বিচার করার দাবি জানান সাভার পৌরসভার এই সাবেক মেয়র।
