লাশের জন্য অপেক্ষা

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৫১
সাভার ট্র্যাজেডিতে গোটা দেশ শোকে বিহ্বল। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারে চলছে শোকের মাতম। স্বজনকে জীবিত পাওয়ার আশা এখন ক্ষীণ। অন্তত মরদেহ ফিরে পাবার আশায় এখনও প্রহর গুণছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা। তাদের বিলাপে ভারী হয়ে উঠছে সাভারের বাতাস। খবর প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের। পাবনা : জেলার পাঁচ উপজেলার ৭ জন নারী-পুরুষ গার্মেন্টস শ্রমিকের লাশ দাফন ও শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। তবে জেলার নয়টি উপজেলায় অন্তত: আরও ২০ জন নিখোঁজ রয়েছে বলে স্বজনদের দাবি। এদিকে জেলা প্রশাসন থেকে দেয়া তালিকায় নিখোঁজের কোন পরিসংখ্যান উল্লে¬খ করা হয়নি। যাদের লাশ দাফন করা হয়েছে তারা হলেন, পাবনা সদর উপজেলার জোতগড়ী জালালপুর গ্রামের টোকন মোল্ল¬ার স্ত্রী সাজেদা খাতুন, দাসপাড়া গ্রামের আবু তাহের খানের ছেলে আলমগীর খান, চর আশুতোষপুর গ্রামের গফুর আলীর ছেলে কামরুল হাসান, আটঘরিয়া উপজেলার চাঁন্দাই গ্রামের লাল মিয়ার স্ত্রী তহুরা খাতুন, ঈশ্বরদী উপজেলার মাড়মী গ্রামের ফিরোজ খাতুন, চাটমোহর উপজেলার করকোলা গ্রামের শুকুমার চন্দ্র দাসের স্ত্রী গোলাপী রানী, ফরিদপুর উপজেলার পাঁচুড়িয়াবাড়ী গ্রামের আবুল কালামের স্ত্রী আরজিনা খাতুন। সূত্র জানায়, জেলার সুজানগর উপজেলার রানীনগর ইউনিয়নের বাদাইতলী গ্রামের বিশু প্রামাণিকের ছেলে ফরিদ প্রামাণিকের লাশ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা খাতুন জানান, জোতগড়ী টোকন মোল্ল¬ার মেয়ে শাপলা, চরপাড়া গ্রামের হাচেনের ছেলে লালন ও আতাইকুলার কাছারপাড়া গ্রামের মেছের সরদারের ছেলে খলিলুর রহমান নিখোঁজ রয়েছেন। গৌরীপুর (ময়মনসিংহ): পাঁচদিন নিখোঁজ থাকার পর পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত হয়েছে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয়েছে গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের খামার সিংজানি গ্রামের ইসমাইল হোসেনের পুত্র শহিদুল ইসলামের। রবিবার বিকালে উদ্ধারকারীদল দেয়াল চাপায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়া গলিত লাশ উদ্ধার করতে গিয়ে প্যান্টের পকেটে রক্ষিত মোবাইল ফোন, পরিচয়পত্র দেখে প্রথমে শহিদুলের মামা আব্দুল গফুরকে ফোন দেন। এ ফোনের সূত্র ধরে শহিদুলের স্ত্রী শিল্পী আক্তার প্যান্ট ও কাগজপত্র দেখে এগুলো তার স্বামীর বলে নিশ্চিত করে। কিশোরগঞ্জ: সাভার ট্রাজেডির পর থেকেই কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার তালজাঙ্গা গ্রামের আল্পনা নিখোঁজ। তিনি ঘটনার সময় ৪র্থ তলায় চেন্টাম গার্মেন্টসে অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার কারখানার আইডি কার্ড নম্বর-২০৫। আল্পনার সন্ধানে স্বামী রাজমিস্ত্রী জাহাঙ্গীর এখন পাগলপ্রায়। সাভারে স্ত্রীর রঙিন ছবি ও নিজের মোবাইল নম্বর সংবলিত প্রচারপত্র বিতরণ করেছেন। তিনি ধ্বংসস্তূপের আশেপাশে ছোটাছুটি করছেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত স্ত্রীর কোন সন্ধান পাননি। স্ত্রীকে জীবিত পাওয়ার আশা তিনি ছেড়েই দিয়েছেন। জাহাঙ্গীর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, অন্তত লাশটি নিয়ে যদি বাড়ি ফিরতে পারেন। দেলদুয়ার (টাঙ্গাইল): রানা প্লাজার ধসে দেলদুয়ারের আটিয়ার বেপারীপাড়া গ্রামের দুই সহোদর এখনো নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে। এরা হলেন আব্দুল আওয়ালের ছেলে স্বপন মিয়া ও রিপন মিয়া। ৬ দিন পার হলেও দুই সহোদরের সন্ধান পাওয়া যায়নি। জানা যায় পরিবারের সকলে তাদের দুই ভাইয়ের সন্ধানে এখনও সাভারের রানা প্লাজায় প্রতীক্ষার প্রহর গুণছে। ফুলবাড়ি (দিনাজপুর): সন্ধান মেলেনি দিনাজপুরের ফুলবাড়ি উপজেলার কাজিহাল ডাঙ্গা গ্রামের আতাউর রহমানের স্ত্রী ও গার্মেন্টস শ্রমিক গুলশান আরা শাবানার। মঙ্গলবার পর্যন্ত তার কোন সন্ধান না পাওয়ায় বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। জানা যায়, জীবিকার তাগিদে স্বামীসহ এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে শাবানা অবস্থান করতেন ঢাকায়। নিজে রানা প্লাজার এক গার্মেন্টসে এবং স্বামী আতাউর রহমান অন্য এক গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। তাই দিয়ে তাদের ছেলেমেয়ের লেখাপড়াসহ সংসারের যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করতেন। ঘটনার দিন সকালে স্বামী-স্ত্রী দুইজনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান নিজ নিজ কর্মস্থলে। শাবানার অপেক্ষায় প্রহর গুণছেন স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা। মহাদেবপুর (নওগাঁ): মহাদেবপুর উপজেলার কালুশহর গ্রামের ঝর্ণার সন্ধান ৬ দিনেও মেলেনি। ঝর্ণাকে পাবার আশায় রানা প্লাজা ধসের পর থেকেই তার স্বামী হান্নান ও স্বজনরা সাভারে অবস্থান করেও তার কোন হদিস পাননি। জীবিত না হলেও তার লাশ ফেরত পেতে ব্যাকুল হয়ে পড়েছে তার পরিবার। মাকে ফিরে পেতে ঘটনার পর থেকেই বাড়িতে বসে অঝরে কেঁদে চলেছে ঝর্ণার এক ছেলে ও এক মেয়ে। জামালপুর: রানা প্লাজা ধসে, জামালপুর সদর, দেওয়ানগঞ্জ ও মাদারগঞ্জ উপজেলায় মোট ২৫ জন ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। তার মধ্যে ১ জনের লাশ উদ্ধার করে গত রবিবার দাফন করা হয়েছে। জামালপুর সদর উপজেলার ছাউনিয়া গ্রামের একই পরিবারের ৩ জনের খোঁজ মিলেনি। এরা হলেন শহিদুল্ল¬া, নূসরাত জাহান রুনা ও ছানুয়ার হোসেন। অপরদিকে একই গ্রামের শামীম, হালিমা, আনিস, খোকন তারাও গার্মেন্টস কর্মী হিসাবে কর্মরত ছিলো। দুর্ঘটনার পর থেকে এ পর্যন্ত তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে জেলার ২৫ জন গার্মেন্টস কর্মী এখনো নিখোঁজ রয়েছে। তাদের স্বজনদের দাবি শুধু লাশটি হলেও যেন তাদের দেয়া হয়। মেলান্দহ (জামালপুর): সাভার ট্রাজেডির ৭দিন অতিবাহিত হলেও জামালপুরের মেলান্দহের তিন সন্তানের রাশেদুজ্জামান রাশেদ এখনো নিখোঁজ। রাশেদ মেলান্দহ উপজেলার চংদারিয়া গ্রামের বাসিন্দা। গত রমজান মাসে তিনি ফ্যান্টম এ্যাপারেল্স লি:এ সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। তিনি রানা প্লাজা ৪-৫ তলায় ডিউটিরত ছিলেন। রাশেদের স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন দোলনা জানান- স্বামী রাশেদের সাথে সর্ব শেষ কথা হয় ২৩ এপ্রিল মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১০টার দিকে। জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা): রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের কাছে দাঁড়িয়ে মঙ্গলবার গার্মেন্টম কর্মী মুসলিমাকে খুঁজছিলেন ভাই ইসমাইল হোসেন। এসময় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বেঁচে না থাকলে এতোদিনে লাশ হয়তো গলে গেছে। এখন উদ্ধার হলেও হয়তো আর চিনতে পারবো না। তবুও বসে আছি। যদি বোনের লাশটি পাই, এই আশায়! সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য চুয়াডাঙ্গা থেকে সাভারে এসে গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছিল মুসলিমা খাতুন ওরফে ছোট বুড়ি। সাভারের ধসে পড়া রানা প্লাজার ৫ম তলায় অবস্থিত একটি গার্মেন্টসে তিনি কাজ করতেন। বুধবারের ভবন ধসের পর থেকে গত ৭ দিনেও তার কোন খোঁজ পায়নি তার পরিবার। গোদাগাড়ী (রাজশাহী) : গোদাগাড়ীর চার শ্রমিকের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। এই চার শ্রমিকের অভিভাবকেরা গত সাতদিন ধরে সাভারের রানা প্লাজার সামনে স্বজনদের ছবি নিয়ে অপেক্ষা করছে। এরা হলো উপজেলার গোগ্রাম ইউনিয়নের কুমরপুর গ্রামের আলাউদ্দীনের মেয়ে ফুলবানু, ফাইজুদ্দীনের মেয়ে রাবিয়া বাসরী, মাটিকাটা ইউনিয়নের পিরিজপুর গ্রামের কাশেম আলীর মেয়ে শিখা খাতুন ও বাসুদেবপুর ইউনিয়নের অভয়া কবুতরপাড়া গ্রামের দুরুল হোদার ছেলে লিটন আলী।