সাভার ভবন ধসের ঘটনায় পোশাক শ্রকিদের অব্যাহত বিক্ষোভ ভাংচুরের কারণে শিল্প-কারখানাগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। শুধু পোশাক কারখানা নয়, পাশাপাশি অন্যান্য শিল্প কারখানাতেও হামলা হচ্ছে এবং এ কারণে সেগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। শিল্পকারখানায় উত্পাদন বন্ধ থাকায় দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কবে এর অবসান হবে তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। বেশ কয়েকজন শিল্পোদ্যাক্তা ইত্তেফাককে জানান, সাভারে ভবন ধসের ঘটনায় রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা বিক্ষোভ করছেন। আর এ সুযোগে একটি স্বার্থান্বেষী মহল এই প্রতিবাদ বিক্ষোভে মদদ দিচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা আচমকা বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে হামলা চালাচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে তারা অগ্নিসংযোগও করেছে। শুধু শিল্প প্রতিষ্ঠান নয়, গুলশানের মত ডিপ্লোমেটিক এলাকাও তাদের তাণ্ডব থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। বিক্ষোভকারীরা সম্প্রতি গুলশান ১ নম্বরে ভারতীয় হাইকমিশনের অফিসের কাছে একাধিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানেও হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করে। একই দিন তারা গুলশানের একটি বহুতল ভবনের কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও ভাংচুর চালায়। এ প্রেক্ষাপটে শিল্পকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। এ হামলা ভাংচুরের ঘটনায় তারা মনে করছেন, এটা শিল্পখাতের বড় ধরনের অশনি সংকেত।
সাভার থেকে ষ্টাফ রিপোর্টার তুহিন খান জানান, সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের বিভিন্নস্থানে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার ফাঁসি এবং গার্মেন্টস নিরাপত্তা জোরদারসহ বেশ কয়েকটি দাবিতে গতকালও বিক্ষোভ করেছে পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এসময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের সাথে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে সাভারের উলাইল, পাকিজা, রেডিওকলোনি এবং আশুলিয়ার চারাবাগ ও বাইপাইল এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভের এ ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসময় শ্রমিকদের উপর লাঠিচার্জের পাশাপাশি বেশ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ছোঁড়ে পুলিশ। এ ঘটনায় কমপক্ষে ৩০ শ্রমিক আহত হন। পরিস্থিতি অবনতির আশংকায় সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের বেশ কয়েকটি গার্মেন্টস বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ভবনে ফাটলের অভিযোগ তুলে সকাল ৯টার দিকে সাভারের উলাইল এলাকার ঢাকা সোয়েটার কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করতে করতে কারখানা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন। এসময় তারা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক সংলগ্ন উলাইল এলাকার এইচ আর টেক্সটাইল, আনলিমা ইয়ার্ন ডাইং এবং আল-মুসলিম পোশাক কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুর করে। এই কারখানাগুলো এ সময় খোলা ছিল। এসময় প্রতিষ্ঠান ৩টি’র শ্রমিকরা বাইরে বেরিয়ে এলে ঢাকা সোয়েটারের শ্রমিকদের সাথে তাদের সংঘর্ষ বাধে। এসময় পুলিশ তাদের বাধা দিতে গেলে ত্রিমুখি সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শ্রমিকদের উপর লাঠিচার্জের পাশাপাশি ৪ রাউন্ড রাবার বুলেট ছোঁড়ে। এ ঘটনায় কমপক্ষে ২০ জন আহত হন। এদিকে, রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা’র ফাঁসি, শ্রমিকদের নিরাপত্তা জোরদারসহ একাধিক দাবিতে পাকিজা ও রেডিওকলোনি এলাকায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। এসময় শ্রমিকরা মহাসড়কে চলাচলরত বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এদিকে, আশুলিয়ার চারাবাগ ও বাইপাইল এলাকায়ও বিক্ষোভ মিছিল হয়। এখানেও পুলিশের সাথে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। শ্রমিক বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্নস্থানে অতিরিক্ত পুলিশের সাথে বিজিবি মোতায়েন রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান বাদল জানান, ফতুল্লার বিসিক এলাকায় গত কয়েক দিনের পোশাক বিক্ষোভের সময় পোশাক কারখানার পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। বিক্ষোভকারী শ্রমিকদের সাথে অধিকাংশ সময় বহিরাগত ও বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দেখা গেছে। এমনকি বন্ধ পোশাক কারখানায়ও হামলা চালানো হয়। দোকানপাট এমনকি রূপগঞ্জে শরীফ মেলামাইন কোম্পানিতেও হামলা চালানো হয়। এ অবস্থায় শিল্পমালিকরা চরম আতংকের মধ্যে রয়েছেন। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ মনে করছে, দিনের পর দিন বিভিন্ন ফ্যাক্টরি ও মিল কারখানায় হামলার ঘটনার পিছনে বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী কোন অপশক্তি কাজ করছে। বিকেএমইএ-এর একটি সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে অনেক বিদেশি ক্রেতা তাদের অর্ডার বাতিল করেছেন। যে সব ক্রেতা বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন তাদের অধিকাংশই ফিরে গেছেন। এ অবস্থায় পোশাক শিল্পের ভবিষ্যতের পাশাপাশি দেশের শ্রমজীবী মানুষের কাজের নিশ্চয়তা নিয়ে অনেকে শঙ্কিত।
তৈরি পোশাক শিল্পকারখানা মালিকদের দাবি কতিপয় শ্রমিক নেতার পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ইন্ধনে শ্রমিক নামধারী লোকজন শ্রমিকদের উস্কানি দিয়ে বিভিন্ন কায়দায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি করে তৈরি পোশাক শিল্পকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছে। তাদের পেছনে ভিন্ন কোন স্বার্থান্বেষীদের ইন্ধন থাকতে পারে। অপরদিকে কয়েকজন শ্রমিক নেতা দাবি করেছেন, শোককে পুঁজি করে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যে হাত না বাড়িয়ে কিছু স্বার্থান্বেষী ভাঙচুর আর হামলা চালিয়ে পোশাক শিল্পের সাথে জড়িত প্রায় কোটি লোককে বেকার করার ষড়যন্ত্র করছে। তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে চাইছে। অপরদিকে একাধিক তৈরি পোশাক কারখানা মালিকের সাথে আলাপকালে তারা জানান, তাদের কারখানায় যারা হামলা চালিয়েছে তারা কেউই তাদের কারখানার শ্রমিক নন। এমনকি গোয়েন্দা সূত্র দাবি করেছে, বিসিক, ইপিজেড ও অন্যান্য পোশাক কারখানায় হামলাকালে লাঠিসোঁটা হাতে শ্রমিকদের অধিকাংশই বহিরাগত। এদিকে পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, একটি মহল নারায়ণগঞ্জকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে নারায়ণগঞ্জে একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন। গত কয়েকদিনে বিভিন্ন পোশাক কারখানায় হামলা ভাঙচুর তার সর্বশেষ প্রমাণ।
তবে বিভিন্ন পোশাক কারখানা মালিকদের সাথে আলাপকালে তারা জানান, তারা কেউ জোর করে শ্রমিকদের কাজে আনেননি। তারপরও পোশাক কারখানায় হামলার কারণ অবশ্যই রহস্যজনক। তারা দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার দাবি জানান। নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকদের সহকর্মী হারানোর সহানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে একটি মহল পোশাক শিল্পে অরাজকতা সৃষ্টি করাসহ দেশের সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই শিল্পকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করছে।
তারা আরও জানান, ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশে আসা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। অপরদিকে জেএসপি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যখন আলোচনা চলছিল -তখন একটি বিশেষ মহল পোশাক শিল্পকে ধ্বংসের লক্ষ্যে সাভার ট্রাজেডিকে পুঁজি করে নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে।
নারায়ণগঞ্জের জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম জানান, শ্রমিক নামধারী কিছু সন্ত্রাসী সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষোভকে পুঁজি করে নারায়ণগঞ্জকে অস্থিতিশীল করাসহ পোশাক শিল্প ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে। তারা সফল হলে নারায়ণগঞ্জেই লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে।
