বেশ কিছুদিন যাবত পত্রপত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা তরুণ-তরুণীর আত্মহত্যার খবর। বিশেষ করে গত কিছুদিনের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। লাখো শিক্ষার্থীকে পিছনে ফেলে ভর্তিযুদ্ধে জয়ী হয়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে পড়াশোনার সুযোগ পেলেন যে শিক্ষার্থীরা, তাদের মধ্যে কেন বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা? গণমাধ্যম বলছে, গত এগারো মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। দু সপ্তাহের মধ্যেই আত্মহত্যা করেছেন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী মিলিয়ে চারজন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এদের প্রত্যেকেই হতাশা ও বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। তাদের কেউ কেউ আর্থিক অভাব-অনটন নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগতেন, এ ছাড়াও কিছু শিক্ষার্থী প্রেমঘটিত কারণে বিষণ্ন ছিলেন। পড়াশোনা শেষ করার পরও চাকরি না পেয়ে হতাশ ছিলেন আরও কয়েকজন।
তরুণদের মাঝে কেন আত্মহত্যার এই প্রবণতা—এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়, প্রেমে ব্যর্থতা ও পারিবারিক অশান্তির কারণে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়ে গেছে। যারা এসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তাদের মাঝে প্রথমে বিষণ্নতা ও মানসিক চাপ তৈরি হয়। পরে সেই বিষণ্নতাই তাদেরকে ধীরে ধীরে আত্মহত্যা করার পথে নিয়ে যায়। পরীক্ষায় খারাপ ফল করা, অন্যের সমালোচনা বা কটুকথা শোনা, পড়াশোনা শেষ করেও বেকার থাকার বিষয়গুলোতেও অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন। সাধারণত কিশোরী বা তরুণীদের আত্মহত্যার কারণ হিসেবে দেখা যায় প্রেমে প্রতারিত হওয়া কিংবা যৌন হয়রানির শিকার হওয়া। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহারও এসবের জন্য অনেকটাই দায়ী।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, জীবনে চলার পথে নানা ঘাত-প্রতিঘাত আসতেই পারে। অনেক তরুণই মানসিক শক্তি দিয়ে সেসবের সমাধান খুঁজে সামনে এগিয়ে যান। তারা বিশ্বাস করেন সমস্যাকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মোকাবিলা করাই জীবন। পক্ষান্তরে অনেকেই নানা ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে আত্মহত্যাকেই সবকিছুর সমাধান মনে করেন। এটা কখনো সমাধান হতে পারে না। জীবনে আনন্দের পাশাপাশি দুঃখ-কষ্ট, হতাশা থাকবে—এ নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে। জীবনে বৈচিত্র্য আছে বলেই জীবন আনন্দময়, সেই আনন্দকে খুঁজে নিতে হবে।
কথাসাহিত্যিক ও মনোবিদ ডা. মোহিত কামাল বললেন, ‘আত্মহত্যা একটি সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। তবে একে শতভাগ নির্মূল করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। আমাদের চারপাশে অনেকেই নানা কারণে মানসিক সমস্যায় ভোগেন। তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় দশ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করেন। বাংলাদেশে এই সংখ্যা বছরে প্রায় দশ হাজার। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাগুলো আলোচিত হলেও নিয়মিত বিরতিতে একই ঘটনা ঘটে চলেছে দেশের প্রায় সব উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই। বিচ্ছিন্ন নন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝেও আত্মহত্যার প্রবণতার হার বেড়েছে। মাত্র কয়েকদিন আগে একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের এক ছাত্রের আত্মহত্যার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, তার পরিবারে অভাব-অনটন বা অন্যকোনো সমস্যা ছিল না। ওই শিক্ষার্থী আচরণে অন্তর্মুখী ছিলেন, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘ইন্ট্রোভার্ট’। তিনি সহজে কারোর সঙ্গে মিশতে পারতেন না, এ নিয়ে একাকীত্বে ভুগতেন। দীর্ঘদিন ধরেই তার মধ্যে হতাশা কাজ করছিল।
আরও বড় আশঙ্কার কথা হলো, এমন চিত্র যে কেবল বাংলাদেশেই, তা নয়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতেও সাধারণ মানুষের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। তালিকার শুরুতেই আছেন তরুণ ও শিক্ষার্থীরা। বিশ্বজুড়েই তরুণদের মাঝে এমন প্রবণতা কারণ হিসেবে পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে নানারকম চাপকে দায়ী করা হচ্ছে।
যখন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া একজন মেধাবী শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন, তখন প্রমাণ হয় তিনি অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। যেজন্য তিনি মা-বাবা ও পরিবারের কথা ভুলে এরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর বিষণ্নতার জন্য অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা বেশিরভাগ মানুষ নিজেকে ধ্বংস করার পথ খুঁজতে থাকে। দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিষণ্নতাকে এখনো রোগ হিসেবে গণ্য করা হয়না। তাই কেউ বিষণ্নতায় ভুগলে একঘরে হয়ে পড়ে। সচেতনতার অভাবেই অনেক মা-বাবা ও অভিভাবক চিকিত্সকের কাছে যাবার প্রয়োজনবোধ করেন না।
এখন স্কুুল পর্যায় থেকে শুরু করে সব উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনোবিদের পদ তৈরি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যায় সহায়তা করার জন্য এক বা একাধিক মনোবিদ দায়িত্ব পালন করছেন। সময়মতো চিকিত্সকের শরণাপন্ন হওয়া ও কাউন্সিলিং করানোর ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আত্মবিশ্বাসের সাথে ভাবতে হবে, যেকোনো সমস্যা থেকেই বেরিয়ে আসা সম্ভব। পরীক্ষায় ফল ভালো হয়নি? আবার মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করুন। আপনি নিশ্চয়ই ভালো করবেন। চাকরি খুঁজতে গিয়ে বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়ে দমে না গিয়ে বিশ্বের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছেন—এরকম বহু উদাহরণও তো জানা। তাই কখনোই আশাহত হওয়া যাবে না। পাশাপাশি অভিভাবক ও চারপাশের মানুষদেরও দায়িত্ব হলো, কাউকে বিষণ্ন হতে দেখলে তার পাশে থেকে তাকে অনুপ্রেরণা জোগানো। তবেই সম্ভব আত্মহত্যার প্রবণতাকে রোধ করা।
মনে রাখতে হবে, জীবন অনেক বড়, অনেক বেশি মূল্যবান। জীবনে কোনো এক সমস্যার জন্য আত্মহত্যা কখনো সমাধান হতে পারে না।
