বিপথগামী শক্তিকে সুপথে আনতে হবে

আপডেট : ০৮ মে ২০১৯, ২১:৫৫

আমাদের এত তাড়াতাড়ি নুসরাতদের কথা ভুলে গেলে চলবে না। নুসরাতকে নিয়ে এত আলোচনা হয়েছে, এত লেখালেখি হয়েছে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মানববন্ধন হয়েছে, এটা সমগ্র বাংলাদেশে একটি প্রতিবাদী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। আমার মনে হলো শুধুমাত্র মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে আমরা আমাদের দায়িত্ব শেষ করে দিতে পারি না। আমাদের দায়িত্ববোধে যদি ধারাবাহিকতা না থাকে, তাহলে নুসরাতের মৃত্যু একটি ঘটনা হয়েই থেকে যাবে। একটি প্রতিবাদী মেয়ে আরমা, সবার অলক্ষ্যে হারিয়ে যাবে।

এমনিতেই জাতি হিসেবে আমরা ধর্মনিরপেক্ষ। আমরা জাতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ  থেকে। কেবল ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধকে জাগ্রত করলে হবে না, আমাদের  দেশাত্মবোধকেও জাগ্রত করতে হবে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে  দেশাত্মবোধের একটা উদাহরণ হলো দেশে তখন কাপড়ের সংকট ছিল। মধ্যবিত্ত শ্রেণি চটে রঙ করে, ব্লক-এর ডিজাইন করে বাসার দরজা জানালায় পর্দা দিত। আর বাংলাদেশের সোনালি আঁশ (পাট) তখন কৃষকের প্রধান অর্থ উপার্জনকারী এবং বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী ফসল ছিল। আর সেই সোনালি আঁশ বাংলাদেশ এখন রপ্তানি করে মধ্যস্বত্বভোগীদের (অন্যদেশ) মাধ্যমে। এটা দুঃখজনক ঘটনা কিন্তু হতাশার কিছু নেই। বাংলাদেশকে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে হবে যাতে আমরা আমাদের সোনালি আঁশের হূতগৌরব ফিরিয়ে আনতে পারি। আন্তর্জাতিক বাজারে পুনরায় নিজেদের স্থান করে নিতে পারি। পাটকে আবার অন্যতম একটি প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী ফসলে রূপান্তর করতে পারি।

শিক্ষা হলো সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম, যার মাধ্যমে মানুষকে আমূল পরিবর্তন করা যায়। আমরা সামগ্রিকভাবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের একটা পরিকল্পনা করতে পারি। যাতে শিশুশ্রেণি  থেকে একটা শিশুর মনে দেশাত্মবোধ জাগ্রত হয়। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতি প্রতিজ্ঞাবোধের জন্ম হয়। শুধু জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ নয় ,একটি জঙ্গিবিরোধী মনোভাবের সৃষ্টি হয়, যাতে কেউ বিপথগামী হতে না পারে। প্রত্যেক শিশুর মন এমনভাবে গঠন করে দিতে হবে যাতে তারা বিশ্বাস করে এবং স্বপ্ন দেখে মাতৃভূমিকে রক্ষা করা এবং এর উন্নয়নে অংশগ্রহণ করা তার প্রধান দায়িত্ব এবং এগুলো সে ছোট ছোট কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিখতে পারবে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সপ্তাহে একদিন তারা নিজেদের ক্লাসরুম পরিষ্কার করবে। প্রতিদিন সঠিকভাবে অ্যাসেম্বলিতে জাতীয় সংগীত গাওয়া, জাতীয় পতাকা উত্তোলনে অংশগ্রহণ করবে। জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় নিজের ভেতরে একটা অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হয়, যা প্রতিটি শিশুর মনে জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় সংগীতের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে অনুপ্রেরণা  যোগাবে। এই পদ্ধতি একটা শিশুর মননশীলতা গঠনে যুগান্তকারী অবদান রাখবে। তাকে প্রতিদিন একবার করে মনে করিয়ে দিতে হবে যে, সে যেখানে যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন নিজের দেশের জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় সংগীতকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিতে হবে। সপ্তাহে অন্তত একদিন জাতির পিতার জীবনী  শোনানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট ক্লাস থাকবে। দেশাত্মবোধ জাগ্রত করার মতো ডকুমেন্টারি/মুভি  দেখাতে হবে। জঙ্গিবাদ বিরোধী কার্টুন সিরিজ, মুভি তৈরি করতে হবে (মিনা কার্টুনের মতো) যা শিশুর মনকে আকৃষ্ট করবে।

শিশুরা টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখতে অনেক পছন্দ করে। আমাদের গতানুগতিক বিজ্ঞাপনের ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পণ্যের বিজ্ঞাপন হবে কিন্তু তাতে দেশাত্মবোধের বার্তা থাকতে হবে। প্রতিটি মুভি/সিনেমা নিজস্ব কাহিনি নিয়ে নির্মিত হবে, কিন্তু তাতে কোনো না কোনোভাবে  দেশাত্মবোধ এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের বার্তা থাকতে হবে। একটা শিশু যখন তার পৃথিবীতে আসার পর থেকে তার পারিপার্শ্বিক সমস্ত পরিবেশে দেশাত্মবোধ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং অসাম্প্রদায়িক বার্তা  দেখবে, তখন সে অনেক বেশি দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে উঠবে। আর তাহলেই বাংলাদেশ  থেকে সম্পূর্ণভাবে জঙ্গিবাদ নির্মূল করা সম্ভব এবং নুসরাতকে নুর হোসেনের মতো অন্ধকারে আলোর পথ প্রদর্শক হিসেবে আমরা মনে রাখব। একজন বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বাঙালি হিসেবে আমি এতটুকু স্বপ্নতো দেখতেই পারি  যে, আমরা আমাদের জাতির পিতাকে তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে একটি জঙ্গিবাদমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথে যাত্রা করেছি—এই বার্তাটুকু পৌঁছে  দেব। এই জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথে নেতৃত্ব দিবে বাংলাদেশের তারুণ্য।

তারুণ্যের বাংলাদেশ ভবিষ্যত্ বাংলাদেশ গড়বে, এক্ষেত্রে তারুণ্যের মূল কাজ হবে ধর্ম এবং রাজনীতির আলাদা অবস্থান নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার মূলমন্ত্র—ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। তারুণ্যের প্রধান দায়িত্ব হবে এই মূলমন্ত্র বাস্তবায়ন করা। ধর্মের অপব্যাখ্যা বন্ধ করতে হবে। ধর্মের অপব্যাখ্যা সারা পৃথিবীব্যাপী জঙ্গিবাদের উত্থানের মূল কারণ, নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার ঘটনা তার বাস্তবতা। বিশ্বমানবতাবোধ এখন হুমকির মুখে। জঙ্গিবাদের সাম্রাজ্যবাদ বিস্তার থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে হলে বিশ্বমানবতাবোধকে জাগ্রত করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের তারুণ্য অগ্রণী ভূমিকা নিবে। বাংলাদেশে যে নাগরিকের আত্মা অজানা কারণে জঙ্গিবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, তাদের আত্মশুদ্ধির দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে হবে। শুধুমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জঙ্গিবিরোধী প্রচারণা চালালে হবে না, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সমস্ত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিশ্বমানবতাকে সংঘবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তারুণ্য তারুণ্যের ভাষা বোঝে। তারুণ্য জানে তার বিপথগামী শক্তিকে কীভাবে জাতি গঠনে, বিশ্বমানবতাকে জাগ্রতকরণে, বিশ্ব থেকে জঙ্গিবাদের সাম্রাজ্যবাদ নির্মূলকরণে নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে ফিরিয়ে আনা যাবে।

n লেখক : ডীন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া