দুধে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশাচ্ছে মুনাফালোভীরা

আপডেট : ০৮ মে ২০১৯, ২২:৪৮

আমিষের চাহিদা মেটাতে সব বয়সী মানুষ কোনো ধরনের সন্দেহ ছাড়াই দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার খাচ্ছে। মানুষের বিশ্বাস এসব খাবার শক্তিবৃদ্ধিসহ শরীর গঠনে সহায়ক। কিন্তু সাধারণ মানুষ জানেন না, একশ্রেণির মুনাফালোভী দীর্ঘদিন ধরে দুধে ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেশাচ্ছে। নিয়মিত এই দুধ পানে ভোক্তার ক্যান্সার, কিডনি নষ্টসহ বিভিন্ন মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

কাঁচা তরল দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯৩টিতেই ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে বলে হাইকোর্টে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। নমুনাগুলোর অণুজৈবিক বিশ্লেষণ রিপোর্ট অনুযায়ী, ৯৩টি নমুনাতে টিপিসি ও কলিফরম কাউন্ট ক্ষতিকর মাত্রায় বিদ্যমান এবং একটি নমুনায় সালমোনেলা পাওয়া গেছে। রাসায়নিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৫টি নমুনাতে সিসা, ৩টিতে আফলাটক্সিন, ১০টিতে টেট্টাসাইক্লিন, একটিতে সিপ্রোফ্লক্সাসিন এবং ৯টিতে পেস্টিসাইট (অ্যান্ডোসালফান) ক্ষতিকর মাত্রায় পাওয়া যায়। প্যাকেটজাত তরল দুধের ৩১টি নমুনার (দেশি ২১টি এবং আমদানি করা ১০টি) মধ্যে ১৭টি দেশি দুধের নমুনাতে টিপিসি ও কলিফরম কাউন্ট, ১৪টিতে মোল্ডস এবং আমদানি করা তরল দুধের একটি নমুনাতে কলিফরম কাউন্ট ক্ষতিকর মাত্রায় বিদ্যমান। রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশি দুধের একটি নমুনাতে আফলাটক্সিন, ৬টিতে টেট্টাসাইক্লিং এবং আমদানি দুধের তিনটিতে টেট্টাসাইক্লিং ক্ষতিকর মাত্রায় রয়েছে। দইয়ের ৩৩টি নমুনার ১৭টিতে টিপিসি, ৬টিতে পলিফরম কাউন্ট, ১৭টিতে ইস্ট/মোল্ড এবং একটিতে সিসা ক্ষতিকর মাত্রায় বিদ্যমান। পশু খাদ্যের ৩০টির মধ্যে ১৬টিতে ক্রোমিয়াম, ৪টিতে আফলাটক্সিন, ২২টিতে টেট্রাসাইক্লিং, ২৬টিতে এনরোফ্লক্সাসিন, ৩০টিতে সিফরোফ্লক্সাসিন এবং ২টিতে পেস্টিসাইট (এন্ডসালফান) ক্ষতিকর মাত্রায় বিদ্যমান।

গতকাল বুধবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি এ কে এম হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এ অবস্থায় দুধ, দই ও পশুখাদ্যে ভেজাল মেশানোর সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের তালিকা চেয়েছে হাইকোর্ট। আগামী ১৫ মে’র মধ্যে এ তালিকা দাখিল করতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।  

জানা গেছে, গরুর খামারিরা দুধে ভেজাল মেশান না। খামারিদের কাছ থেকে দুধ কিনে নেওয়ার পর সেই দুধ যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য মুনাফালোভীরা দুধে রাসায়নিক মেশায়। এ ব্যাপারে র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, দুধসহ যে কোনো খাদ্যসামগ্রী যারা ভেজাল করে তারা খুনি। তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।

আইসিডিডিআর,বি’র চিফ ফিজিশিয়ান ডা. আজহারুল ইসলামও এ ধরনের ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার পক্ষে। তিনি বলেন, রাসায়নিক মেশানো দুধ নিয়মিত খেলে শরীরে রাসায়নিক জমতে থাকে। এক সময় ক্যান্সার, কিডনি নষ্টসহ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয় ভোক্তা। আর সালমোনেলায় দুই ধরনের টাইফয়েড হয়। তিনি বলেন, আগে একটি ইউনিয়নে একজন ক্যান্সার রোগী খুঁজে পাওয়া যেত না। অথচ এখন ঘরে ঘরে ক্যান্সার রোগী। এর মূল কারণ খাদ্যে ভেজাল।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। এ প্রসঙ্গে মহাখালীর জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. সুলতান মোহাম্মদ শামছুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় মন্ত্রণালয় সম্পৃক্ত। কিন্তু আমাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সমন্বয় করে খাদ্যে ভেজাল রোধ করতে জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।  

এর আগে হাইকোর্টের নির্দেশে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মো. মাহবুব কবিরকে আহ্বায়ক করে ১৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। যা আদালতকেও অবহিত করা হয়। ওই কমিটির কর্মপরিকল্পনায় রয়েছে : চার সপ্তাহের মধ্যে তরল ও পাস্তুরিত দুধের নমুনা সংগ্রহ, গবেষণাগারে পরীক্ষা ও ফলাফল পর্যালোচনা। পশুখাদ্যের নমুনা সংগ্রহ এবং গবেষণাগারে পরীক্ষা ও ফলাফল পর্যালোচনা। প্রাথমিক উত্পাদন ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ, ফলাফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং যথাযথ সুপারিশ প্রণয়ন।