রোহিঙ্গাদের কারণে ঝুঁকিতে বাংলাদেশের সামাজিক অর্জন

আপডেট : ১০ মে ২০১৯, ০০:৩২

কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের প্রায় সকলেই খাদ্য সহায়তার আওতায় এসেছে। কিন্তু সেখানে বড় সমস্যা পুষ্টিহীনতা। হাতে নগদ অর্থ না থাকায় তাদের অনেকের পর্যাপ্ত খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই। ফলে উন্নয়ন সহযোগীদের দেওয়া খাদ্য সহায়তার উপর তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে। এদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সামাজিক খাতে বাংলাদেশের যে অর্জন সেটা কক্সবাজার অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ, পুষ্টিহীনতা, জন্ম নিয়ন্ত্রণসহ নানা বিষয়ে রোহিঙ্গারা অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউট (আইএফপিআরআই) এর এক গবেষণায় এসব বিষয় উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা কোনোমতে টিকে থাকার মতো। তবে তাদের অনেকেই স্থানীয়ভাবে কাজকর্ম করছে। তারা স্থানীয়দের চেয়ে কম মজুরিতে কাজ করছে। এক্ষেত্রে যদি ব্যাপকভাবে তাদের কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয় তাহলে স্থানীয় শ্রম বাজারে ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত সেমিনারে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। বিআইডিএস এর মহাপরিচালক কে এ এস মুর্শিদের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রতিনিধি রিচার্ড রাগান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইএফপিআরআই গবেষক ড. পাওয়েল দোরোস, বিআইডিএস এর গবেষক ড. বিনায়ক সেন ও ড. মোহাম্মদ ইউনুস।

উপস্থাপিত গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৭ লাখ ৭১ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। তারা টিকে আছে কিন্তু তাদের জীবনমান উন্নত নয়। ২০১৭ সালের আগস্টের পরে আসা রোহিঙ্গাদের প্রতিমাসে মাথাপিছু ভোগব্যয় মাত্র ১৫৮৯ টাকা। যারা এই সময়ের আগে এসেছে তাদের মাথপিছু ভোগব্যয়ের পরিমাণ ১৮১৮ টাকা। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মাথাপিছু ভোগ ব্যয় রোহিঙ্গাদের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেশি। রোহিঙ্গাদের মাঝে পুষ্টিহীনতার তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩২ থেকে ৩৬ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদী পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এবং ১২ থেকে ১৩ শতাংশ শিশু ভয়াবহ অপুষ্টির শিকার।

ড. গোলাম নবী মজুমদার তার উপস্থাপনায় উল্লেখ করেন বাংলাদেশ থেকে ৪ গুণ বড় হলেও মিয়ানমারের জনসংখ্যা বাংলাদেশের মাত্র এক-তৃতীয়াংশের সমান। অথচ বলপ্রয়োগ করে তারা তাদের মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ বাংলাদেশে পাঠিয়েছে।

উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদেরকে আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এটা সবাই জানেন। যেহেতু এটি একটি অতি মানবিক বিষয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদারতা ও মানবতাবোধে আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি।

একটি অধিবেশনে সভাপতির বক্তব্যে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, অর্থনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের সামাজিক খাতেও রোহিঙ্গারা নেতিবাচক প্রভাব রাখছে। তিনি বলেন, মাথাপিছু আয়ের তুলনায় বাংলাদেশে সামজিক অর্জনগুলো অনেক ভালো। নারীদের শিক্ষার হার, জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার, শিশু মৃত্যুর হার কম। কিন্তু রোহিঙ্গাদের মধ্যে নারী শিক্ষা, জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার শূন্যের কোঠায়, শিশুমৃত্যুর হারও বেশি। রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশের সামাজিক অর্জনগুলো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

কে এ এস মুরশিদ বলেন, আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বোচ্চ সহায়তা দিচ্ছে সরকার। গবেষণার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, সার্বিকভাবে রোহিঙ্গাদের পুষ্টির অবস্থা একটু খারাপ। কেননা তাদের নির্দিষ্ট কিছু আইটেমের খাবার সরবরাহ করা হয়। তাদের হাতে নগদ অর্থ নেই। ফলে তারা নিজেরাই কিছু কিনে খেতে পারেন না। বিআইডিএস এর গবেষক ড. মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, কিছু রোহিঙ্গা নগদ টাকার জন্য স্থানীয়ভাবে কাজ করে। এক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দাদের তুলনায় তারা কম কাজ পাচ্ছে।