বাড়ছে বাজেট :কমছে উন্নয়ন বরাদ্দের হার

আপডেট : ০১ জুন ২০১৩, ২২:৩৪
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালের ৩০ জুন তাজউদ্দিন আহমেদ যে বাজেট ঘোষণা করেছিলেন তার আকার ছিলো মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে মোট বরাদ্দের মধ্যে ৫০১ কোটি টাকা ছিলো উন্নয়ন বরাদ্দ বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাবদ বরাদ্দ। আগামী ৬ জুন বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন, যার আকার হচ্ছে ২ লাখ ২২ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা। টাকার অংকে বিশাল বাজেট হলেও পার্থক্য হলো দেশ স্বাধীন হবার পর মোট বাজেটের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ থাকতো কিন্তু আসছে বাজেটে ৬৬ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা এডিপি বরাদ্দ থাকলেও তা মোট বাজেটের মাত্র ২৯ শতাংশ। বিগত বাজেটগুলোর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ১৯৯৫-৯৬ সালের পর থেকেই বাজেটের উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ৫০ ভাগের নিচে নেমে আসে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নিয়ম রক্ষার বাজেটে তা সর্বনিম্ন ২৩ থেকে ২৫ শতাংশে নেমে আসে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৮২-৮৩ ও ৮৩-৮৪ অর্থবছরের বাজেটেও প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ বরাদ্দ রেখেছিলেন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয়ের জন্য। তবে আশার কথা হলো বিগত ৪টি বাজেটের তুলনায় আসছে অর্থবছরের বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। মূলত সরকারের অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বাজেটের আকার বিশাল হচ্ছে। সরকারের বিশাল আকারের ঋণ পরিশোধ, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধ, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বৃদ্ধি আর সামাজিক নিরাপত্তাবলয় বাড়ানোর ফলে বছর বছর বাজেটের আকার বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় বাড়ছে না উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ। বিশাল ব্যয় নির্বাহ করার জন্য বাজেটে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। তবে অনুদান নির্ভরতা পূর্বের চেয়ে অনেক কমেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্যানুযায়ী, ১৯৯১-১৯৯২ সালে দেশের মোট বৈদেশিক সহায়তায় অনুদানের অংশ ছিলো ৯০ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে ঋণের পরিমাণ ছিলো সাড়ে ৯ শতাংশ। ২০১১-২০১২ অর্থবছরে মোট সহায়তার মাত্র ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ অনুদান এবং ঋণ রয়েছে ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ। বাজেটে ঘাটতি :অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বাজেটের আকার বাড়ানোর সাথে সাথে ঋণের আকারও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। বিশাল ব্যায়ের এ বাজেট বাস্তবায়ন করার জন্য ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপরেও ঘাটতি থেকে যাবে প্রায় ৫৫ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। প্রকল্প সহায়তা আকারে ২৪ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা পাবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপরেও বিশাল আকারের ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকগুলো থেকে ২৫ হাজার ৭শ’ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজেটের আকার অনুযায়ী এ ঘাটতি মোটেই বিশাল আকারের নয়। বিগত কয়েক বছর ধরেই ঘাটতির আকার মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) ৫ শতাংশের মধ্যেই রয়েছে। বরাদ্দের বিভাজন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দ থাকছে ২২ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা, গত অর্থবছর ছিল ২২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। বাজেটে খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ থাকছে ৫ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। অতি দরিদ্রদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এক হাজার ২শ’ কোটি টাকা। চর জীবিকায়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ থাকছে ১৫৭ কোটি টাকা। কৃষি উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ তিন হাজার ৭২১ কোটি টাকা। উন্নয়ন বাজেটে মোট প্রকল্পসংখ্যা ১১৭৬টি। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প মাত্র ৫০টি, যা গত বছরের উন্নয়ন বাজেটের সবুজ পাতায় বরাদ্দবিহীনভাবে ছিল। সে হিসেবে বলা যায়, নির্বাচনের বছর বলে অপরিকল্পিতভাবে বাজেটের আকার বাড়ানো হয়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও পদ্মা সেতুর গুরুত্ব বিবেচনায় এডিপিতে পরিবহন খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে ছয় হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বরাদ্দসহ পরিবহন খাতে মোট বরাদ্দের পরিমাণ ১৫ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা যা মোট এডিপি’র প্রায় ২৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এডিপিতে তুলনামূলক অধিক বরাদ্দ প্রাপ্ত অন্যান্য খাত হলো, শিক্ষা ও ধর্ম-আট হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা, পল্লী উন্নয়ন ও পল্লী প্রতিষ্ঠান ৬ হাজার ৬২২ কোটি টাকা, ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ণ ৫ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য, পুষ্টি জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ খাতে ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা এবং কৃষি খাতে ৩ হাজার ৭২১ কোটি টাকা থাকছে।