[ আ লো ক পা ত ]

গার্মেন্ট শিল্পের উন্নয়নে চাই ব্যাপক দায়িত্বশীলতা

আপডেট : ০২ জুন ২০১৩, ২১:০৩
রানা প্লাজা বিপর্যয়ে এক হাজার একশত পঁচিশ জনের বেশি মানুষের যেমন প্রাণহানি ঘটেছে তেমনি অসংখ্য গার্মেন্ট শ্রমিক স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। এরই মধ্যে রেশমাকে নিয়ে অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে সতের দিন পর রেশমাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধার কাজে অংশ নেয়া সংস্থাগুলোর প্রাপ্ত উপকরণ, সামর্থ্য, দক্ষতা ও সমন্বয়ের বিষয়টি পুন:পরীক্ষার প্রসঙ্গও এক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে। শ্রমিকের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বৃদ্ধিতে আরও কী ধরনের প্রস্তুতি জরুরি সেদিকে সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে। আশার কথা বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএও উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে যে, তারা প্রকৃতপক্ষে একটি তারের ওপর দিয়ে হাঁটছে। ক্রেতার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় বিদেশে বিদ্যমান তাদের বিশাল বাজার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং এই বাজার ধরে রাখা কঠিনতর হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে পশ্চিমা প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো হালে খুবই সমালোচনামুখর। এএফএল-সিআইও, মানবাধিকার সংস্থাসমূহ এবং ইউরোপের সুশীল সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও গণমাধ্যমগুলো সরবে প্রচার করছে। একথা অনস্বীকার্য, বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরি নিতান্তই কম। চীনের সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে চীনে এ খাতে যে ব্যয় হয় বাংলাদেশে তার এক-পঞ্চমাংশ খরচ করলেই চলে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মৌলিক কিছু দায়-দায়িত্বের কথা কিছুতেই বিস্মৃত হতে পারে না। আমাদের গার্মেন্ট শ্রমিকদের মজুরি কম একথা আগেই বলেছি। কিন্তু এটাই কাজ করে যাওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র যুক্তি হতে পারে না। আমাদের ভুললে চলবে না, বাংলাদেশে দায়িত্বশীল ও পরিবেশগত যে দুর্বলতাসমূহ বিদ্যমান তাও দূর করতে হবে। দুর্নীতি গার্মেন্ট শিল্পকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। কর্পোরেট প্রশাসনের অনুপস্থিতিতে ন্যূনতম নিয়ম-কানুনও প্রতিপালিত হচ্ছে না। আইনের অনুগামী না হওয়ার নেপথ্য কারণ হয়ত একটি যে, জাতীয় সংসদে অন্তত ২৫ জন সদস্য গার্মেন্ট শিল্পে লগ্নি করেছেন। একই সাথে অধিকাংশ গার্মেন্ট মালিকই মনে করেন যে, দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এদেশে তারা অবকাঠামোগত ত্রুটি, শ্রম আইন এমনকী হত্যাকান্ডের মত অপরাধের সাজা থেকেও অব্যাহতি পেয়ে যেতে সমর্থ হবেন। গত কয়েকদিন ধরে গার্মেন্ট শিল্পকে নিয়ে যা ঘটছে তা এককথায় অভাবনীয়। সেমিনার, কর্মশালা, টক শো’র পাশাপাশি আইএলও এবং ক্রেতা দেশসমূহের প্রতিনিধিরাও একের পর এক ঢাকা আসছেন। এ প্রতিনিধিরা যেমন চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন একই সাথে সংকটের কথাও জানা যাচ্ছে। বীমা নিয়ে কথা উঠেছে। গার্মেন্ট মালিকরা তাদের সরঞ্জামাদির বীমা অনিবার্যভাবেই সম্পন্ন করে থাকেন। কিন্তু বীমা সুবিধা থেকে বঞ্চিত তাদের সকল শ্রমিক। রানা প্লাজার শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও একথা সত্য। শ্রম সচিব শ্রম আইনের ৯৯ ধারার উল্লেখ করে বলেছেন যে, ঐ ধারাবলে যে সব কারখানায় দু’শোর বেশি শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে তাদের প্রত্যেককে গ্রুপ বীমার আওতায় আনতে হবে। বীমা আইনের উক্ত ধারা পরিবর্তন সাপেক্ষে এখন একশত শ্রমিক হলেই গ্রুপ বীমার আওতায় আসবে। আমি মনে করি বিজিএমইএ বিষয়টি কার্যকর করবে। প্রসঙ্গক্রমে গার্মেন্ট খাতের তিনটি গুরুতর সংকটের উল্লেখ না করলেই নয়। প্রথমেই বলতে হয়, পেশাগতভাবে দক্ষ কারখানা পরিদর্শক ও শিল্প পুলিশের সীমাবদ্ধতার কথা। কারখানাসমূহ বিদ্যমান নীতিমালা অনুসরণ করে চলছে কীনা তা দেখার জন্য উল্লেখিত জনবল বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আমাদের রয়েছে ৭০ জন ইন্সপেক্টরের কম, কিন্তু গার্মেন্টের সংখ্যা ৪ হাজারের অধিক। ফলে তাদের মাধ্যমে কারখানাগুলো সুনিরীক্ষিত হওয়া অসম্ভব। এর ফলে কারখানা মালিকরা কর্মস্থলকে শ্রমিক বান্ধব ও নিরাপদ করার ক্ষেত্রে অবহেলা ও ঔদাসীন্য প্রদর্শন করে চলেছে। একই সাথে দুর্নীতির লাগামও টেনে ধরা হচ্ছে না। আমাদের রাষ্ট্রের জন্য আরেকটি দুঃখের খবর হল শ্রম আইনে দায়েরকৃত মামলার পরিণতি সম্পর্কিত। আমাদের দেশে ৩৬ লাখেরও বেশি লোক গার্মেন্টস শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত। গার্মেন্ট ভিন্ন অপরাপর শিল্প কারখানায়ও অনেক অনেক শ্রমিক বিদ্যমান। বাংলাদেশের ৭টি শ্রম আদালতে ১৩ হাজার মামলা রয়েছে। শুধুমাত্র ঢাকাতেই ৯ হাজার মামলা বিচারাধীন। কোন কোন জেলায় শ্রম আদালতই নেই। ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলাই নথিভুক্ত হতে পারছে না। ফলে অসন্তুষ্ট শ্রমিক সব সময়ই সুবিচার পাচ্ছে এমনটি ভাবা সংগত হবে না। যেসব জেলায় শ্রম আদালত নেই তারা দূরে গিয়ে মামলা করে হয়রানির শিকার হবে এমটিই শুধু ভাবেন না, এও বিশ্বাস করেন যে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে মামলার নিষ্পত্তিতে। এই মামলায় লড়তে গিয়ে অফিস কামাইয়ের কারণে হয়ত তাকে চাকুরিচ্যুত হতে হবে। আইনের সমর্থন পাওয়ার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের জন্য এসব এখন চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যা সংবিধানের ১৪ ধারারও পরিপন্থি। তৃতীয় যে কারণটির উল্লেখ জরুরি তা হল ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার সম্পর্কিত। একই সাথে মজুরি বৃদ্ধি, নিয়োগপত্র প্রদান ও মাতৃত্বকালীন ছুটি মঞ্জুরের বিষয়টিও আলোচনার দাবি রাখে। স্পর্শকাতর এই বিষয়গুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে সরকার অবশ্য বর্তমানে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। গার্মেন্ট শিল্পের জন্য সরকার একটি ওয়েজবোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে শিল্পে একটি সন্তোষজনক পরিবেশ তৈরি হবে বলে প্রত্যাশা। এদিকে গার্মেন্ট ইউনিয়নের সাথে যুক্ত শ্রমিক নেতাদেরকে অনেক মালিক ‘ট্রাবল মেকার’ হিসেবে গণ্য করেন। তাদেরকে পুলিশেও সোপর্দ করা হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না শ্রমিকের প্রতি মালিকের এই আচরণে পরস্পরের দূরত্বই বৃদ্ধি পায়। প্রকৃতপক্ষে মালিক শ্রমিকের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপনের এটাই প্রকৃষ্ট সময়। কোরিয়া এবং জাপানে শ্রমিক-মালিকের সম্পর্ক কীভাবে নির্ণীত হয় সে বিষয়টি সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করতে হবে। উল্লেখিত প্রেক্ষাপটে আইএলওর সিনিয়র প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফর এবং গার্মেন্ট শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টদের বিস্তারিত আলোচনার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ববহ। তারা সরকারের সাথেও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। আইএলও’র ডেপুটি মহাপরিচালক মি হাউন ঘো যথার্থই বলেছেন যে, সংকট উত্তরণে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি খুবই জরুরি। তিনি স্থায়ী সামাজিক সংলাপের উপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। এহেন প্রস্তাবকে মহত্ হিসেবে বিবেচনা করে বলা হচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বয়কটের থেকে এটি বেশি কার্যকর হবে। কেননা বয়কট হতাশা, বেকারত্ব (বিশেষ করে মহিলা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে) ও দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দেবে শ্রমিক সমাজকে। আইএলও প্রতিনিধি জুনের সংসদ অধিবেশনে শ্রম আইন সংশোধনে বিল আনার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আরও করণীয় হল, যেসব গার্মেন্ট মালিক অনিরাপদ ভবন থেকে সরে গিয়ে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরে আগ্রহী তাদেরকেও সহযোগিতা করতে হবে। কারিগরি সহযোগিতা ও লগ্নির ক্ষেত্রে আইএলও নেতা বিদেশি ক্রেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। কার্যকর পরিদর্শনের লক্ষ্যে ৬ মাসের মধ্যে ২শত অতিরিক্ত পরিদর্শক নিয়োগের জন্যও আইএলও সুপারিশ করেছে। তবে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল উল্লেখিত পরামর্শ সতর্কতার সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। আশার কথা হল, রানা প্লাজা ধসের পর এই সংকট নিরসনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনুপস্থিত। আমাদের প্রত্যাশা, কার্যকর পরিবর্তনের লক্ষ্যে অভিন্ন ও একমুখীন পদক্ষেপ যেন গৃহীত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডাকে অনুধাবন করতে হবে যে, বাংলাদেশের গার্মেন্ট শ্রমিক ও তাদের নিরাপদ কর্মস্থল সৃষ্টিতে তাদেরকে লগ্নি করতে হবে। এক্ষেত্রে বৃটিশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের খুচরা ক্রেতাদের স্বাক্ষরিক চুক্তিটি উত্সাহব্যঞ্জক। ঐ চুক্তিতে বাংলাদেশের গার্মেন্ট ভবনের নিরাপত্তা এবং অগ্নিকাণ্ড নিরোধের ব্যাপারটি গুরুত্ব পেয়েছে। চুক্তিতে নিরাপত্তার লক্ষ্যে নিয়মিত পরিদর্শনের বিষয়টি যেমন গুরুত্ব পেয়েছে তেমনি কারখানার সংস্কারে ক্ষুদ্র ক্রেতাদের অনুদান প্রদানের কথাও বলা হয়েছে। সত্যি বলতে কী, এসব পদক্ষেপের ফলে শিল্পের দুর্দশার রাতারাতি অবসান ঘটবে। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি গ্যাপ, ওয়ালমার্ট সিয়ার্ম বলেছে তারা ঐ চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে না। এক্ষেত্রে বলব, ঐ সিদ্ধান্তের ব্যাপারটি তাদের পুনর্বিবেচনা করা উচিত। ক্লীন ক্লথস ক্যাম্পেনে উল্লেখিত পদক্ষেপ খুবই গুরুত্ব বহন করবে। উল্লেখ্য, রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণে ৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রয়োজন পড়বে। একথা অনস্বীকার্য, উল্লেখিত ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় শ্রমিকের নিরাপত্তার স্বার্থে মিডিয়া, জাতিসংঘ, ব্র্যান্ডসমূহ এবং আমাদের সুশীল সমাজ গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে। গার্মেন্ট শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদেরকে অনুধাবন করতে হবে যে, সহিংসতা কোন ফল বয়ে আনে না। যা প্রয়োজন তা হলো দায়িত্বশীল আচরণ। পুরো গার্মেন্ট শিল্পে আশাবাদ জেগে উঠুক রেশমার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের অনুরূপ। ভাষান্তর: কায়কোবাদ মিলন লেখক :সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক [email protected]