আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেয়ারবাজার চাঙ্গা করতে আসন্ন বাজেটে বেশ কিছু উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশের করমুক্ত সীমা বাড়ানো, প্রিমিয়ামে কর অব্যাহতি, মিউচুয়াল ফান্ড ও বন্ডের বিনিয়োগে কর রেয়াত এবং কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ অব্যাহত রাখা। ইতিমধ্যে শেয়ারবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকও ৯০০ কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সূত্র জানায়, শেয়ারবাজারে প্রায় ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী তাদের পুঁজি হারিয়েছেন যাদের ভোট পাওয়া নিয়ে সরকারের অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি রয়েছে তাদের পরিবারের একাধিক ভোট। যা আগামী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সরকার নির্বাচনের আগে শেয়ারবাজারকে চাঙ্গা করে বিনিয়োগকারীদের ভোট নিজেদের করে নিতে চেষ্টা করছেন। এরই প্রেক্ষিতে আসন্ন বাজেটে নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন উদ্যোগ। আয় বাড়িয়ে ব্যয় বৃদ্ধির লক্ষ্যও নেয়া হচ্ছে বাজেটে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশের উপর কর ছাড়ের সীমা বেড়ে ১০ হাজার টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা হতে পারে। বর্তমানে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশে কোন কর দিতে হয় না। শেয়ার প্রিমিয়ামে বিদ্যমান ৩ শতাংশ কর প্রত্যাহার হচ্ছে। মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও বন্ডের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হারে কর রেয়াত দেয়ার চিন্তা চলছে। বর্তমানে সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রেয়াতি হারে কর দেয়ার সু্বিধা পায়। এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি আগামী বাজেটেও শেয়ারবাজারে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ থাকছে। বর্তমানে ১০ শতাংশ কর দিয়ে এ খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে টাকার উত্স সম্পর্কে কোন প্রশ্ন করা হচ্ছে না। তবে গত দুই বছর যাবত্ শেয়ারবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও এ খাতে আশানুরূপ অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ হয় নি। গত ২০১১-১২ অর্থ বছরে এ খাতে মাত্র ৩৮২ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। আর চলতি অর্থ বছরেও এর পরিমাণ ৪০০ কোটি টাকা ছাড়াবে না বলে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এদিকে কালো টাকা বিনিয়োগের এমন অবাধ সুযোগ নিয়ে আপত্তি রয়েছে বৈধ পথে উপার্জনকারী করদাতাদের। আপত্তি রয়েছে সুশীল নাগরিকদেরও।
শেয়ারবাজার চাঙ্গা করতে সরকারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত ২৯ মে বাংলাদেশ ব্যাংক ৯০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা থেকে সরকারকে যে অর্থ দেয়, তার অংশ দিয়ে শেয়ারবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সুদ মওকুফ ও ঋণ পুনঃতফসিলে এ তহবিল গঠন করা হবে। মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর আবেদনের প্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রণালয়ের সুপারিশে পুনঃঅর্থায়নযোগ্য এ তহবিল করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এদিকে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে গভীরতম মহাধস শুরু হয়। এই ধসে ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক প্রায় ৯ হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজারে নেমে আসে। ধস ঠেকাতে সরকার ৫ হাজার কোটি টাকার বাংলাদেশ ফান্ড গঠন করার ঘোষণা দেয়। ব্যাংকার ও ব্যাংক মালিকরা পৃথক আরেকটি ৫ হাজার কোটি টাকার ফান্ড করার আশ্বাস দেন। সরকার ২১ দফা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর পাশাপাশি শেয়ারবাজারে কালোটাকা বিনিয়োগেরও সুযোগ দেয়া হয়। তবে তার কোনোটিই বাজারে প্রভাব রাখতে পারেনি।
এর কারণ হিসেবে সম্পদ ব্যবস্থাপনাকারী একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাজারে আসার কথা বলা হলেও সরকারের ফান্ডটি ছোট আকারে এসেছে। প্রণোদনা প্যাকেজের কিছু কিছু পদক্ষেপ এখনো পালন করা হয়নি। আর ব্যাংক মালিকদের ৫ হাজার কোটি টাকার ফান্ড বায়বীয় ঘোষণায় পরিণত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন আশ্বাস আর ঘোষণা দেয়ার পর তা সঠিকভাবে পালন না করায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনাস্থা বেড়েছে। তাই এখন সরকার উদ্যোগ নেয়ার পরও অনেকেই আশ্বস্ত হতে পারছেন না। এদিকে আস্থার অভাবে সরকারের উদ্যোগ নেয়ার ঘোষণার পরও বাজারে লেনদেন হচ্ছে ৫শ কোটি টাকার নিচে। সূচক কিছুটা বাড়লেও লেনদেন না বাড়ায় বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীরা সরকারের ঘোষণায় আশ্বস্ত হতে পারছেন না।
জানা গেছে, আগামী অর্থ বছরে সরকার আয় বাড়িয়ে ব্যয় বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। আগামী আর্থিক বছরে মোট ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা করছে সরকার। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আদায় করবে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। গত তিন বছর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়তে যাচ্ছে চলতি অর্থ বছরে। ইতিমধ্যে গত ১০ মাসে রাজস্ব আদায়ে সোয়া ৪ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর। অর্থ বছরের শেষ নাগাদ এ ঘাটতি ৫ হাজার কোটি টাকায় ঠেকতে পারে। এ অবস্থায় আসছে অর্থ বছরে এনবিআরের পক্ষে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকে ‘উচ্চাভিলাষী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান। তিনি বলেন, ‘জিডিপি’র উপর ভিত্তি করে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হয়। চলতি অর্থ বছরে এটি ৭ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হলেও অর্জন হবে ৬ শতাংশের মত। চলতি বছর রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছে না। এই অবস্থায় বড় ধরনের নতুন কর না বসালে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।’
রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ রাখতে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন এনবিআর চেয়ারম্যান। একই অনুরোধ ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও। বিভিন্ন সময় এনবিআর চেয়ারম্যান প্রকশ্যেই নিজের অপারগতার কথা জানিয়েছেন। বলেছেন, এই লক্ষ্যমাত্রা হবে অবাস্তব। তবে অর্থমন্ত্রী তার অনড় অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়ে বলেছেন, ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকাই আদায় করতে হবে। তবে প্রাক্কলন অনুযায়ী রাজস্ব আয় যদি না হয় তবে বাজেট ঘাটতি প্রাক্কলনের তুলনায় বেড়ে যেতে পারে। সরকার চাইছে, করের আওতা বাড়িয়ে হলেও রাজস্ব আয় বাড়াতে। এ লক্ষ্যে আগামী অর্থ বছরে সাড়ে তিন লাখ নতুন করদাতা অনুসন্ধান করবে এনবিআর। একইসাথে কোম্পানি ও বিদ্যমান ব্যক্তি করদাতাদের নিবিড় তদারকির আওতায় আনা হবে।
