সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের অধিকার

আপডেট : ০৩ জুন ২০১৩, ২১:০৮
আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বিশেষ কিছু অধিকার ভোগ করিতেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় যেমন রহিয়াছে, রহিয়াছে পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ। কিন্তু সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জন্য নাই বিশেষ কোনো অধিকার কিংবা সুযোগ-সুবিধা। সমতলে যেই কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অস্তিত্ব মেলে তাহাদের মধ্যে ডালু, গারো, হাজং, খাসি, মাহাতো, ওঁরাও, পাত্র, পাহান, রাখাইন ও সাঁওতাল উল্লেখযোগ্য। ইহাদের বাস উত্তরবঙ্গে যেমন রহিয়াছে, তেমনি দক্ষিণাঞ্চলে তাহাদের আবাস রহিয়াছে। ইহাদের প্রধান সমস্যা হইলো তাহারা নানান কারণে নিজ নিজ ভূমি হারাইয়াছে, ক্রমশ দরিদ্র হইয়া পড়িতেছে এবং নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত হইয়া অধিক প্রান্তিক হইয়া পড়িতেছে। তাহাদের কেহ কেহ নিজ ধর্ম ত্যাগ করিয়া খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হইয়াছে কেবল দুই মুঠি খাবারের সংস্থানের জন্য। কিন্তু কোনো কিছুতেই তাহাদের প্রান্তিকতা এড়ানো যায় নাই। ব্রিটিশ আমল হইতেই সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের ভূমি দখল শুরু হইয়াছে, কখনো উন্নয়নের উসিলায় সরকারিভাবে, কখনোবা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে। জাতিগত সংখ্যালঘু হইবার কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠের দিক হইতে নানান নিপীড়নের শিকার হইয়াছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা। রাজনৈতিক মদদপুষ্ট দুর্বৃত্তেরা জোর করিয়া দখল করিয়াছে তাহাদের জমি-জমা। অথবা এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হইয়াছে যে, নামমাত্র মূল্যে জমি বিক্রি করিতে বাধ্য হইয়াছে তাহারা। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা অনেক ক্ষেত্রে নিগ্রহের শিকার হইয়াছে। অনেক ক্ষেত্রে দেশত্যাগ করিয়া এইসব মানুষ উদ্বাস্তু হইয়াছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতি সার্বিক অনুদার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাহাদের অধিকার লইয়া তেমন করিয়া কেহ ভাবে নাই। তাহাদের ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি চর্চা ও নিজস্ব জীবনাচরণের অধিকার সংরক্ষণে বিশেষ কোনো দায়িত্ব রাষ্ট্র পালন করে নাই। সরকারের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধিকার সংরক্ষণ আইন করিবার কথা, কিন্তু আজও তাহা হয় নাই। বর্তমান সরকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার কথা তাহাদের নির্বাচন ইশতেহারে উল্লেখ করিয়াছিল। নৃবিজ্ঞানীরা বলেন, বাঙালি জাতির উত্পত্তি ও গঠনে মিশিয়া আছে এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অনেক পূর্বসূরি। বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ক্রমবিকাশের ধারায় আসিয়া মিশিয়াছে তাহাদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। তাহাদের ঐতিহ্য, মর্যাদা, স্বার্থ বা অধিকারের প্রশ্নগুলি তাই কেবল তাহাদের জন্য জরুরি নহে, বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্যও জরুরি। সংবিধানের ২৮(৪) ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্র দেশের জনগণের অনগ্রসর অংশের বিশেষ অধিকার প্রদানের জন্য যেকোনো আইন প্রণয়ন করিবার ক্ষেত্রে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। পার্বত্য অঞ্চলের ন্যায় সমতলের জেলা পরিষদে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীদের আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। উন্নয়নের নামে সমতলে তাহাদের ভূমি ও জঙ্গল দখল করিবার প্রবণতা হইতে সংশ্লিষ্ট সকলকেই বিরত থাকিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে তাহারাও বাংলাদেশের নাগরিক, তাহাদেরও নিজ নিজ সংস্কৃতি চর্চা করিবার, বাংলাদেশের আলো-হাওয়ায় নিঃশ্বাস নিবার অধিকার রহিয়াছে। সর্বোপরি পিছাইয়া থাকা জনগোষ্ঠী হিসাবে তাহাদের বাড়তি অধিকার, সুযোগ-সুবিধা ও যত্ন-পরিচর্যার আওতায় আনিতে হইবে।