৮৩ কার্যদিবস পর গতকাল সোমবার সংসদের বাজেট অধিবেশেনে যোগ দিয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল। তবে প্রায় সোয়া বছর পর সংসদে যোগ দিলেও দুই ঘণ্টার মাথায় সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে ওয়াক আউট করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে দেয়া মুলতবি প্রস্তাবও প্রত্যাহার করে নিয়েছে বিরোধী দল। অবশ্য ওয়াকআউট করলেও আজ মঙ্গলবার বিরোধী দল যথারীতি সংসদে ফিরবে বলে জানা গেছে। তারা চলতি অধিবেশনের গোটা সময় জুড়েই সংসদে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে ।
গতকাল বিরোধী দলের সংসদীয় দলের সভাশেষে সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলীয় প্রধান হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, ‘আমরা সংসদে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে নতুন স্পিকার অতীতের স্পিকারের মতো আমাদের কথা বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবেন না, আমরা ‘সাইনিং লেডি স্পিকারের’ কাছ থেকে এটাই আশা করি।’ তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন ইস্যুতে আমরা ৫০টির মতো মুলতবি প্রস্তাব জমা দিয়েছি। আশা করি স্পিকার আমাদের প্রস্তাব গ্রহণ করে আলোচনার সুযোগ দেবেন। সংসদে কতদিন থাকবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সংসদের পুরো সময় আমরা থাকতে চাই। কিন্তু সরকারি দলের সদস্যদের আচার-আচরণের ওপর নির্ভর করবে কতদিন থাকতে পারব।
গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টায় নতুন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে নবম জাতীয় সংসদের অষ্টাদশ অধিবেশন শুরুর ২০ মিনিটের মাথায় বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ও শরিক দলগুলোর ৩৮ জন সংসদ সদস্য অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন। সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, জাতীয় পাটির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদসহ ক্ষমতাসীন জোটের সংসদ সদস্যরা এ সময় টেবিল চাপড়ে তাদের স্বাগত জানান। স্পিকার শিরীন শারমিনও বিরোধী দলীয় নেতাকে অভিনন্দন জানান। খালেদা জিয়া বিরোধী দলীয় নেতার আসনে বসার আগে নতুন স্পিকার হাত তুলে তাকে সালাম জানান। খালেদা জিয়াও হাত উঠিয়ে সালামের জবাব দেন। ৫১ মিনিট সংসদে অবস্থানের পর মাগরিবের বিরতির সময় বেরিয়ে যান খালেদা জিয়া।
বিরতির পর সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্ব চলে। এক পর্যায়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে সভা সমাবেশের ওপর সরকারের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। বক্তব্য শেষে তার নেতৃত্বে ওয়াক আউট করেন বিরোধী দলীয় এমপিরা। এর আগে বিরোধী দলীয় এমপি রেহেনা আক্তার রানু পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ধর্মপ্রতিমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের শান্তিপূর্ণ অবস্থানে হামলা করে তাদের হাজার হাজার কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। নির্বিচারে যারা আলেমদের হত্যা করেছে তাদের বিচারের কোন উদ্যোগ নেবেন কিনা। জবাবে ধর্মপ্রতিমন্ত্রী বলেন, সেদিন শাপলা চত্বরে একটি লোকও মারা যায়নি।
এদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের যোগদানে এক প্রাণবন্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয় জাতীয় সংসদে। সংসদে যোগ দিলেও তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে দেয়া মুলতবি প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয় তারা। মুলতবি প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেন বিএনপি দলীয় এমপি ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন। সংসদে যোগদানের আগে বিরোধী দলের পার্লামেন্টারি বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ মুলতবি প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়।
এর আগে বিকাল ৪ টায় সংসদ ভবনে যান বেগম খালেদা জিয়া। তিনি সংসদ ভবনে বিরোধী নেতার কক্ষে বিরোধী এমপিদের নিয়ে দেড়ঘন্টা বৈঠক করেন। এ সময় বিরোধী দলের এমপিরা বাজেট অধিবেশেনের বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন। তারা শেয়ারবাজার, পদ্মা সেতু, হলমার্কসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ৫০টির মতো মুলতবি প্রস্তাব দিয়েছেন। জমাকৃত প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করতে চান তারা। কিন্তু সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে কোনো প্রস্তাবের ওপরে আলোচনা করতে চান না বলে জানান। বৈঠক শেষে নামাজ আদায়ের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিরোধী দলীয় এমপিরা অধিবেশন কক্ষে যান।
বিরোধী নেতা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি দলীয় এমপি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, এমকে আনোয়ার, বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, জামায়াতের দুই এমপি শামসুল ইসলাম ও হামিদুর রহমান আজাদসহ বিরোধী জোটের অন্য এমপিরা গতকাল সংসদে উপস্থিত ছিলেন। তবে কারাগারে থাকায় বিএনপি দলীয় এমপি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, বিদেশে চিকিত্সাধীন থাকায় শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ও এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম সংসদে অনুপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, বিরোধী দল গত বছরের ১৮ মার্চ সংসদে ফিরে মাত্র তিন কার্যদিবস ছিল। তারা ২০ মার্চ মাগরিবের নামাজের বিরতির পর বেরিয়ে গেলেও আর অধিবেশনে ফিরেনি।
জাতীয় ঐক্যমত গড়ে তোলার আহ্বান স্পিকারের
অধিবেশনের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে দেশের প্রথম মহিলা স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে মত পার্থক্য ও ভিন্নতা আলোচনার মধ্যদিয়ে নিরসন সম্ভব। জাতীয় ঐক্যমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। যে কোন সমস্যা সংসদে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। আমি আশা করবো সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা অধিবেশন পরিচালনায় আমাকে সহায়তা করবেন। পরে তাকে স্পিকার নির্বাচিত করায় তিনি প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। একই সাথে বিরোধী দলীয় নেতা ও উপনেতাসহ সকল সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানান।
স্পিকারের স্বাগত বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সদস্য তোফায়েল আহমদ, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, হুইপ আসম ফিরোজ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ফ্লোর নিয়ে স্পিকারকে ধন্যবাদ জানান। তোফায়েল আহমদ বলেন, বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। অধিবেশন কক্ষ কানায় কানায় পূর্ণ। গ্যালারিও পূর্ণ। হুইপ ফিরোজ ও মেনন বিরোধী দলকে অভিনন্দন জানান। বিরোধী দলের পক্ষে বেগম নিলুফার চৌধুরী মনি স্পীকারকে ধন্যবাদ জানান।
৩ জুলাই পর্যন্ত অধিবেশন চলবে
এদিকে বিকাল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকারের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের কার্যউপদেষ্টা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতি অধিবেশন আগামী ৩ জুলাই পর্যন্ত চলবে। প্রতি কার্যদিবসে অধিবেশন বিকাল ৫টায় শুরু হয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে। প্রয়োজনে এ সময়সীমা বাড়ানো ও কমানোর ব্যাপারে স্পিকারকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
কমিটির সদস্য এবং সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও কমিটির সদস্য ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী, সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তোফায়েল আহমদ, মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, আলহাজ্ব অ্যাডভোকেট রহমত আলী, রাশেদ খান মেনন এবং আবদুল মতিন খসরু বৈঠকে অংশ নেন।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মো. কামরুল ইসলাম বিশেষ আমন্ত্রণে বৈঠকে যোগদান করেন। সংসদের সচিব মো. মাহ্ফুজুর রহমান ও সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় জানানো হয় আগামী ৬ জুন ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরের বাজেট সংসদে উপস্থান এবং ৩০ জুন পাস হবে। বাজেটের উপর ৪০ ঘণ্টা আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। প্রয়োজনবোধে স্পিকার অধিবেশনের সময় বাড়াতে বা কমাতে পারবেন।
সভাপতি প্যানেল নির্বাচন
অধিবেশনের শুরুতেই স্পিকার সংসদ পরিচালনার জন্য পাঁচ সদস্যের সভাপতিমন্ডলীর প্যানেল নির্বাচন করেন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংসদ পরিচালনার জন্য নির্বাচিত সভাপতিমন্ডলীর সদস্যরা হলেন সরকারি দলের মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, এবিএম গোলাম মোস্তফা, জাতীয় পার্টির (জাপা) মো. মুজিবুল হক, বিএনপির জাফরুল ইসলাম চৌধুরী এবং বেগম ফরিদা রহমান।
শোক প্রস্তাব গ্রহণ
স্পিকার সাবেক দু’জন সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা সংসদে সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এরা হলেন সৈয়দ মাসুদ রেজা এবং যুক্তফ্রন্টের অ্যাডভোকেট মেহেরুন্নেসা খাতুন। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও যুক্তফ্রন্টের সাবেক প্রচার সম্পাদক এম এ হান্নান, ভাষা সৈনিক ও আগরতলা মামলার অন্যতম আসামি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) খুরশীদ উদ্দিন আহমেদ, ভাষা সৈনিক আবদুল জব্বার সরকার, ভাষা সৈনিক নিবেদিতা নাগ এবং ভাষা সৈনিক অধ্যাপক সারা তৈফুর মাহমুদ। এছাড়া গত ২৪ এপ্রিল সাভারে ভবন ধসের ঘটনায়, ঘূর্ণিঝড় মহাসেন এবং বিভিন্ন দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে জাতীয় সংসদ গভীর শোক প্রকাশ করে। নিহতদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোক-সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়। পরে তাদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পিরোজপুর-১ আসনের সদস্য একেএম আউয়াল মোনাজাত পরিচালনা করেন।
